আপনার জিজ্ঞাসা অনুযায়ী উৎসগুলোতে প্রদত্ত তথ্যগুলোর ভিত্তিতে বিস্তারিত উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
১. ঝিল্লিবিহীন ও ঝিল্লিবদ্ধ অঙ্গাণুর নাম
কোষের অঙ্গাণুগুলো ঝিল্লির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির ভিত্তিতে দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। উৎসগুলোতে দেওয়া মনে রাখার টিপস (Mnemonic) থেকে এই অঙ্গাণুগুলোর নাম পাওয়া যায়:
| অঙ্গাণুর ধরণ | মনে রাখার উপায় (Mnemonic) | অঙ্গাণুগুলোর নাম |
|---|---|---|
| ঝিল্লিবদ্ধ কোষীয় অঙ্গাণু | মা ভাই-ভাবী এরা পা-গল |
মা $\to$ মাইটোকন্ড্রিয়া (Mitochondria) ভা $\to$ ভ্যাকুওল (Vacuole) ভাবী $\to$ ভেসিকল (Vesicle) এরা $\to$ এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম (Endoplasmic reticulum) পা $\to$ পারক্সিসোম (Peroxysome) গল $\to$ গলজি বডি (Golgi body) ল $\to$ লাইসোজোম (Lisosome) |
| ঝিল্লিবিহীন কোষীয় অঙ্গাণু | সে-রা মা-মা-ই প্রথম |
সে $\to$ সেন্ট্রিওল (Centriole) রা $\to$ রাইবোসোম (Ribosome) মা $\to$ মাইক্রোটিবিউলস (Microtubules) মা $\to$ মাইক্রোফিলামেন্ট (Microfilaments) ই $\to$ ইন্টারমিডিয়েট ফিলামেন্ট (Intermediate filaments) প্রথম $\to$ প্রটিওসোম (Proteosome) |
২. কোষের বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ ও উদাহরণ
উৎসগুলোতে কোষের প্রকারভেদ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত কয়েকটি ছক (Concept Map) উল্লেখ করা হয়েছে, যার রেফারেন্সে অধ্যাপক আলীম স্যারের নাম রয়েছে।
কোষের প্রকারভেদ ও উদাহরণ (Concept Map অনুযায়ী):
কোষ (Cell): প্রধানত দুটি প্রকারভেদ:
-
প্রাককোষ্ (Prokaryotic cell): এদের সুগঠিত নিউক্লিয়াস নেই।
- উদাহরণ: নীলাভ-সবুজ শৈবাল, ব্যাকটেরিয়া।
-
সুকোষ্ (Eukaryotic cell): এদের সুগঠিত নিউক্লিয়াস আছে।
- প্রকারভেদ (Based on function):
- জনন কোষ্ (Germ cell): e.g., শুক্রাণু, ডিম্বাণু ইত্যাদি (n)।
- দেহকোষ্ (Somatic cell): e.g., যকৃৎ কোষ, বৃক্ক কোষ, রক্তকণিকা ইত্যাদি (2n)।
- প্রকারভেদ (Based on function):
প্রাককোষ (Prokaryotic) ও সুকোষ (Eukaryotic) কোষের পার্থক্য:
| বৈশিষ্ট্য | প্রাককোষ্ (Prokaryotic Cell) | সুকোষ্ (Eukaryotic Cell) |
|---|---|---|
| ঝিল্লিবদ্ধ অঙ্গাণু | অনুপস্থিত (মাইটোকন্ড্রিয়া, গলজি বডি, লাইসোজোম থাকে না) | উপস্থিত (মাইটোকন্ড্রিয়া, প্লাস্টিড, গলজি বডি ইত্যাদি থাকে) |
| নিউক্লিয়াস | সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে না (নিউক্লিওয়েড) | সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে |
| ক্রোমোসোম | DNA ও নন-হিস্টোন প্রোটিন দিয়ে গঠিত | DNA ও হিস্টোন প্রোটিন দিয়ে গঠিত |
| রাইবোসোম | 70S (50S + 30S) | 80S (60S + 40S) |
| কোষ বিভাজন | অ্যামাইটোসিস (Amytosis) বা দ্বিবিভাজন | মাইটোসিস বা মায়োসিস |
৩. কোষ প্রাচীরের ভৌত গঠন
উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদের কোষ প্রাচীরের মূল উপাদান হলো সেলুলোজ। ভৌত গঠন অনুযায়ী কোষ প্রাচীরের প্রধান স্তরগুলো হলো: মধ্যপর্দা (Middle Lamella), প্রাথমিক প্রাচীর (Primary Wall) এবং মাধ্যমিক প্রাচীর (Secondary Wall)।
- উপাদান: সেলুলোজ ছাড়াও হেমিসেলুলোজ, পেক্টিন, লিগনিন, সুবেরিন, কিউটিন ইত্যাদি থাকে।
- কোষ প্রাচীরের ক্ষুদ্রতম গাঠনিক একক হলো মাইসেলি (Micelle)। মাইসেলিগুলো একত্রিত হয়ে মাইক্রোফাইব্রিল গঠন করে।
- উদ্ভিদ কোষ প্রাচীরে সেলুলোজের পরিমাণ প্রায় ৪০%, হেমিসেলুলোজের ২০%, পেক্টিনের ৩৫%, এবং প্রোটিনের ৫% থাকে।
৪. বিভিন্ন অঙ্গাণুর গঠন ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ
উৎসগুলোতে কোষ অঙ্গাণু ও তাদের কাজের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হয়েছে:
| কোষ অঙ্গাণু | গঠন | গুরুত্বপূর্ণ কাজ |
|---|---|---|
| কোষ প্রাচীর (Cell wall) | সেলুলোজ, পেক্টিন ও অন্যান্য উপাদান নিয়ে গঠিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক প্রাচীর | কোষকে দৃঢ়তা দান, আকৃতি রক্ষা এবং ভিতরের অঙ্গাণুকে রক্ষা করে। |
| কোষ ঝিল্লি (Cell membrane) | প্রোটিন ও লিপিড দ্বিস্তর দিয়ে গঠিত | প্রোটোপ্লাজমকে আবৃত করে, অর্ধভেদ্য পর্দা হিসেবে কাজ করে এবং কোষকে সুরক্ষা দেয়। |
| নিউক্লিয়াস (Nucleus) | দ্বি-স্তরবিশিষ্ট ঝিল্লিযুক্ত, নিউক্লিওপ্লাজম, ক্রোমাটিন জালিকা ও নিউক্লিওলাস নিয়ে গঠিত | কোষের সব জৈবিক কাজ নিয়ন্ত্রণ, বংশগতির ধারা বহন এবং কোষ বিভাজনে সাহায্য করে। |
| মাইটোকন্ড্রিয়া (Mitochondria) | দ্বি-স্তরবিশিষ্ট ঝিল্লি, কৃষ্টি ও ম্যাট্রিক্স, DNA, RNA ও 70S রাইবোসোম থাকে | এটি কোষের শক্তির ঘর (Power House) নামে পরিচিত। শ্বসনের মাধ্যমে ATP সংশ্লেষণ করে। |
| রাইবোসোম (Ribosome) | রাইবোনিউক্লিও প্রোটিন কণা, 70S বা 80S ধরণের | এটি প্রোটিন ফ্যাক্টরি (Protein factory) নামে পরিচিত। প্রোটিন সংশ্লেষণ করা এর প্রধান কাজ। |
| গলজি বডি (Golgi Bodies) | চ্যাপ্টা সিস্টার্নি, ভেসিকল ও ভ্যাকুওল নিয়ে গঠিত | প্রোটিন সংশ্লেষণ, প্যাকেজিং ও পরিবহনে সহায়তা করে (Traffic Police নামে পরিচিত)। |
| লাইসোজোম (Lysosome) | একক ঝিল্লিযুক্ত থলি, হাইড্রোলাইটিক এনজাইম থাকে | 'আত্মঘাতী থলিকা' (Suicidal bag) নামে পরিচিত। ফাগোসাইটোসিস, অটোফ্যাগি, অটোলাইসিস ও জীবাণু ধ্বংস করা। |
| প্লাস্টিড (Plastid) | দ্বি-স্তরবিশিষ্ট ঝিল্লি, গ্রানা, স্ট্রোমা ও DNA/RNA থাকে | সালোকসংশ্লেষণে খাদ্য তৈরি ও খাদ্য সঞ্চয় করে। |
৫. ক্রোমোসোমের প্রকারভেদ ও কাজ
ক্রোমোসোমের প্রকারভেদ (সেন্ট্রোমিয়ারের অবস্থানের ভিত্তিতে):
ক্রোমোসোম সাধারণত সেন্ট্রোমিয়ারের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে চার প্রকারের হতে পারে, যা চিত্রসহ বর্ণনা করা হয়েছে:
- মেটাসেন্ট্রিক (Metacentric): সেন্ট্রোমিয়ার ক্রোমোসোমের মাঝখানে থাকে, দেখতে V-আকৃতির হয়।
- সাব-মেটাসেন্ট্রিক (Submetacentric): সেন্ট্রোমিয়ার মাঝখান থেকে একটু দূরে থাকে, দেখতে L-আকৃতির হয়।
- অ্যাক্রোসেন্ট্রিক (Acrocentric): সেন্ট্রোমিয়ার ক্রোমোজোমের প্রায় এক প্রান্তে থাকে, দেখতে J-আকৃতির হয়।
- টেলোসেন্ট্রিক (Telocentric): সেন্ট্রোমিয়ার ক্রোমোসোমের প্রান্তে থাকে, দেখতে রড-আকৃতির হয়।
ক্রোমোসোমের কাজ:
ক্রোমোসোম ডিএনএ এবং প্রোটিন (ইউক্যারিওটিক কোষে হিস্টোন প্রোটিন) দিয়ে গঠিত। এর প্রধান কাজগুলো হলো:
- বংশগতির ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করা।
- কোষ বিভাজনে সাহায্য করা।
- জীবের লিঙ্গ নির্ধারণ করা (সেক্স ক্রোমোসোম X, Y)।
- DNA ধারণ করা এবং বংশপরম্পরায় বৈশিষ্ট্য বহন করা।
৬. নিউক্লিক এসিডের প্রকার, গঠন ও কাজ
নিউক্লিক এসিড প্রধানত দুই প্রকার: DNA (Deoxyribonucleic acid) এবং RNA (Ribonucleic acid)।
গঠন:
- নিউক্লিক এসিডের গাঠনিক একক হলো নিউক্লিওটাইড (Nucleotide)।
- প্রতিটি নিউক্লিওটাইড তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত: পেন্টোজ সুগার (Sugar), নাইট্রোজেন বেস (Base) বা ক্ষার এবং ফসফরিক এসিড (Phosphoric acid)।
- DNA গঠন (ওয়াটসন ও ক্রিকের মডেল): এটি দ্বিসূত্রক হেলিক্স (Double Helix) গঠন করে। এর ব্যাস ২০ Å (২ nm)। প্রতি পূর্ণ প্যাঁচ (turn) এ ১০ জোড়া বেস পেয়ার থাকে এবং দৈর্ঘ্য ৩৪ Å (৩.৪ nm) হয়।
- নাইট্রোজেন বেস: DNA-তে অ্যাডেনিন (A), গুয়ানিন (G), সাইটোসিন (C), এবং থাইমিন (T) থাকে। RNA-তে থাইমিনের পরিবর্তে ইউরাসিল (U) থাকে।
প্রকার ও কাজ (RNA):
RNA তিন প্রকারের:
- mRNA (Messenger RNA): DNA থেকে জেনেটিক কোড বহন করে।
- tRNA (Transfer RNA): সাইটোপ্লাজম থেকে রাইবোসোমে অ্যামাইনো এসিড বহন করে।
- rRNA (Ribosomal RNA): এটি রাইবোসোমের গাঠনিক উপাদান (মোট RNA-এর প্রায় ৮০-৯০% rRNA)।
RNA-এর প্রধান কাজ হলো প্রোটিন সংশ্লেষণ (ট্রান্সলেশন) প্রক্রিয়ায় সাহায্য করা।
৭. DNA রেপ্লিকেশনে ব্যবহৃত এনজাইম
DNA রেপ্লিকেশনের জন্য একাধিক এনজাইম ও প্রোটিন প্রয়োজন। এদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এনজাইমগুলো হলো:
- DNA পলিমারেজ (DNA Polymerase I, II, III): নতুন DNA স্ট্র্যান্ড সংশ্লেষণ করে।
- DNA লাইগেজ (DNA Ligase): রেপ্লিকেশনের সময় সৃষ্ট ছোট ছোট DNA খণ্ডগুলোকে (ওকাজাকি খণ্ডক) যুক্ত করে।
- RNA পলিমারেজ (RNA Polymerase I): প্রাইমার RNA সংশ্লেষণ করে।
- হেলিকেজ (Helicase): DNA-এর দুটি স্ট্র্যান্ডকে হাইড্রোজেন বন্ধন ভেঙে আলাদা করে।
- টোঁপোইসোমারেজ (Topoisomerase) / ডিএনএ গাইরেজ (Gyrase): DNA-এর জট পাকানো (supercoiling) রোধ করে।
- SSBP (Single Strand Binding Protein): একক DNA স্ট্র্যান্ডকে স্থিতিশীল রাখে।
৮. ট্রান্সক্রিপশন ও ট্রান্সলেশনের মধ্যে পার্থক্য
উৎসগুলোতে ট্রান্সক্রিপশন ও ট্রান্সলেশনের সংজ্ঞা এবং স্থান উল্লেখ করা হয়েছে।
| বৈশিষ্ট্য | ট্রান্সক্রিপশন (Transcription) | ট্রান্সলেশন (Translation) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | DNA থেকে mRNA তৈরি হওয়া। | mRNA-এর কোড অনুযায়ী রাইবোসোমে প্রোটিন তৈরি হওয়া। |
| স্থান | সুকোয়ী কোষে নিউক্লিয়াসের মধ্যে। | সাইটোপ্লাজমে রাইবোসোমের উপর। |
| এনজাইম | RNA পলিমারেজ। | রাইবোসোম, tRNA, অ্যামাইনো এসিড, এনজাইম। |
৯. জিনের একক, ধরণ ও কাজ
জিনের একক:
জিন হলো বংশগতির একক। উৎস অনুযায়ী, জিনের তিনটি কার্যকরী একক রয়েছে:
- সিস্ট্রন (Cistron): জিনের কার্যকরী একক।
- মিউটন (Muton): জিনের ক্ষুদ্রতম পরিবর্তন একক (মিউটেশন একক)।
- রেকন (Recon): জিনের পুনঃসংযোজন (recombination) একক।
জিনের ধরণ (অপারন মডেল অনুযায়ী):
একটি অপারেটরের প্রধান চারটি অংশ (যা জিনের ধরণ হিসেবে কাজ করে) উল্লেখ করা হয়েছে:
- স্ট্রাকচারাল জিন (Structural gene): প্রোটিন সংশ্লেষণ ঘটায়।
- প্রমোটর জিন (Promoter gene): RNA পলিমারেজ আবদ্ধ হওয়ার স্থান।
- অপারেটর জিন (Operator gene): নিয়ন্ত্রক প্রোটিনকে বাঁধতে সাহায্য করে।
- রেগুলেটর জিন (Regulator gene) বা নিয়ন্ত্রক জিন: নিয়ন্ত্রক প্রোটিন তৈরি করে।
জিনের কাজ:
জিন বংশগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। DNA-এর একটি অংশ হিসেবে এটি mRNA সংশ্লেষণ করে (ট্রান্সক্রিপশন) এবং পরে প্রোটিন তৈরি করে জীবের চরিত্র নিয়ন্ত্রণ করে।
১০. সূচনা ও সমাপ্তির কোডন
জেনেটিক কোডে মোট ৬৪টি কোডন রয়েছে, যার মধ্যে কিছু সূচনা (Start) এবং কিছু সমাপ্তি (Stop) কোডন হিসেবে কাজ করে।
সূচনা কোডন (Start Codon):
- AUG হলো সূচনা কোডন।
- এটি মিথিওনিন (Methionine) অ্যামাইনো এসিডকে কোড করে।
সমাপ্তির কোডন (Stop Codons) বা টারমিনেটর কোডন:
- তিনটি সমাপ্তির কোডন হলো: UAA, UAG, এবং UGA।
- এদেরকে ননসেন্স কোডনও বলা হয়। এই কোডনগুলো কোনো অ্যামাইনো এসিডকে কোড করে না, বরং প্রোটিন সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া সমাপ্ত করে।
১১. জেনেটিক কোড
জেনেটিক কোড হলো DNA বা RNA (mRNA)-এর নাইট্রোজেন বেসগুলোর সেই সজ্জা, যা নির্দিষ্ট অ্যামাইনো এসিডকে নির্দেশ করে।
জেনেটিক কোডের বৈশিষ্ট্য:
জেনেটিক কোডের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- সুনির্দিষ্টতা (Specificity): একটি কোডন শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট অ্যামাইনো এসিডকে কোড করে।
- রিডানডেন্সি বা ডিজেনারেসি (Redundancy/Degeneracy): একটি অ্যামাইনো এসিড একাধিক কোডন দ্বারা কোড হতে পারে।
- নন-ওভারল্যাপিং (Non-overlapping): একটি কোডন পাশের কোডনের সাথে ওভারল্যাপ করে না।
- ইউনিভার্সাল (Universal): কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সকল জীবের জন্য কোডন একই অ্যামাইনো এসিডকে কোড করে।
জেনেটিক কোডকে একটি অনুবাদকের সাথে তুলনা করা যেতে পারে, যেখানে বর্ণমালা (নাইট্রোজেন বেস) ব্যবহার করে জীবন পরিচালনার নির্দেশিকা (প্রোটিন) তৈরি করা হয়। AUG কোডন হলো সেই নির্দেশনা শুরু করার সংকেত, ঠিক যেমন একটি নতুন অধ্যায় শুরু করার জন্য একটি নির্দিষ্ট চিহ্নের প্রয়োজন হয়, আর UAA, UAG, UGA হলো সমাপ্তি নির্দেশিকা, যা সেই অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটায়।
১২. অ্যামাইটোসিস (Amitosis) এর সংজ্ঞা ও কোথায় হয়
সংজ্ঞা
অ্যামাইটোসিস হলো সরল বা প্রত্যক্ষ কোষ বিভাজন। এই প্রক্রিয়ায় নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজম সরাসরি বিভক্ত হয়ে দুটি কোষে পরিণত হয়। অ্যামাইটোসিসে স্পিন্ডল যন্ত্র (Spindle apparatus) গঠিত হয় না, এবং ক্রোমোজোমও গঠিত হয় না।
কোথায় হয় (স্থান)
অ্যামাইটোসিস সাধারণত নিম্নশ্রেণির জীব এবং কিছু বিশেষ কোষে ঘটে:
- প্রাক-কোষীয় জীব (Prokaryotic Cell): যেমন- নীলাভ-সবুজ শৈবাল এবং ব্যাকটেরিয়া।
- নিম্ন শ্রেণির সুকেন্দ্রীয় জীব: যেমন- ইস্ট (Yeast) এবং অ্যামিবা।
- উচ্চতর প্রাণীর বিশেষ কোষ: মানুষের লোহিত রক্তকণিকা (RBC) এবং কিছু প্যাথলজিক্যাল অবস্থা বা অসুস্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত কোষ।
১৩. কোষচক্র (Cell Cycle)
কোষচক্র হলো সেই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি কোষ সৃষ্টি হয়, বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তীতে বিভক্ত হয়ে অপত্য কোষ তৈরি করে। ১৯৫৩ সালে হাওয়ার্ড (Howard) এবং পেল্ক (Pelc) এই চক্রটি আবিষ্কার করেন।
কোষচক্র প্রধানত দুটি পর্যায় নিয়ে গঠিত:
[Image of cell cycle diagram]-
ইন্টারফেজ (Interphase):
এটি কোষ বিভাজনের প্রস্তুতিমূলক বা বিশ্রাম দশা (resting phase)। কোষ তার জীবনের প্রায় ৯০-৯৫% সময় এই দশায় অতিবাহিত করে। ইন্টারফেজ তিনটি উপ-দশায় বিভক্ত:
- G1 দশা (Gap 1): এই ধাপে RNA, প্রোটিন সংশ্লেষণ এবং অঙ্গাণুগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ডিএনএ সংশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এটি কোষচক্রের মোট সময়ের প্রায় ৩০-৪০%।
- S দশা (Synthesis): এই দশায় DNA সংশ্লেষণ ঘটে, ফলে DNA দ্বিগুণ হয়। এটি কোষচক্রের মোট সময়ের প্রায় ৩০-৫০%।
- G2 দশা (Gap 2): এই ধাপেও প্রোটিন ও RNA সংশ্লেষণ হয় এবং মাইটোসিসের জন্য প্রয়োজনীয় ATP তৈরি হয়। সেন্ট্রোজোম দ্বিবিভাজন ঘটে। এটি ১০-২০% সময় নেয়।
-
M দশা (Mitosis Phase):
এটি প্রকৃত কোষ বিভাজন পর্যায়, যা কোষচক্রের মোট সময়ের প্রায় ৫-১০% নেয়।
১৪. মাইটোসিস ও মিয়োসিস-১ এর ধাপ সমূহ (গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা)
মাইটোসিস এর ধাপসমূহ (গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা):
মাইটোসিস বা সমীকরণিক বিভাজন চারটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হয়:
[Image of Mitosis stages]| ধাপ | গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা |
|---|---|
| ১. প্রোফেজ (Prophase) | ক্রোমাটিন তন্তু ঘনীভূত হয়ে ক্রোমোজোম গঠন করে। নিউক্লিওলাস ও নিউক্লিয়ার মেমব্রেন বিলুপ্তি শুরু হয়। |
| ২. প্রো-মেটাফেজ (Pro-metaphase) | স্পিন্ডল ফাইবার গঠিত হয় এবং ক্রোমোজোমগুলো কাইনেটোকোরে স্পিন্ডল ফাইবারের সাথে যুক্ত হয়। নিউক্লিয়ার মেমব্রেন সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায়। |
| ৩. মেটাফেজ (Metaphase) | ক্রোমোজোমগুলো কোষের বিষুবীয় অঞ্চলে সজ্জিত হয়ে মেটাফেজ প্লেট (Metaphase Plate) গঠন করে। |
| ৪. অ্যানাফেজ (Anaphase) | প্রতিটি ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার বিভক্ত হয়। সিস্টার ক্রোমাটিডগুলো অপত্য ক্রোমোজোম হিসেবে মেরুর দিকে চলতে শুরু করে, দেখতে V, L, J, I আকৃতির হয়। |
| ৫. টেলোফেজ (Telophase) | অপত্য ক্রোমোজোমগুলো মেরুতে পৌঁছায়। নিউক্লিওলাস ও নিউক্লিয়ার মেমব্রেন পুনরায় গঠিত হয়। ক্রোমোজোমগুলি আবার ক্রোমাটিন তন্তুতে পরিণত হয়। |
মিয়োসিস-১ এর প্রোফেজ-১ এর উপধাপসমূহ (গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা):
মিয়োসিস-১ এর প্রোফেজ-১ হলো সবচেয়ে দীর্ঘ ও জটিল ধাপ।
| উপধাপ | গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা |
|---|---|
| ১. লেপটোনেমা (Leptonema) | ক্রোমাটিন সূত্র ঘনীভূত হয়ে ক্রোমোজোম গঠন করে এবং ক্রোমিয়ার দৃশ্যমান হয়। |
| ২. জাইগোনেমা (Zygonema) | সাইন্যাপসিস (Synapsis) ঘটে—সমসংস্থ ক্রোমোজোমগুলো জোড়ায় জোড়ায় আসে। এই জোড়াকে বাইভ্যালেন্ট (Bivalent) বলে। |
| ৩. প্যাকিনেমা (Pachynema) | প্রতিটি বাইভ্যালেন্ট ৪টি ক্রোমাটিড বা টেট্রাড (Tetrad) গঠন করে। এই ধাপে ক্রসিং ওভার (Crossing Over) শুরু হয়। |
| ৪. ডিপ্লোনেমা (Diplonema) | সমসংস্থ ক্রোমোজোমগুলোর মধ্যে বিকর্ষণ শুরু হয়, কিন্তু কায়াজমা (Chiasmata) সৃষ্টি হয় (যেখানে ক্রসিং ওভার হয়েছে)। |
| ৫. ডায়াকাইনেসিস (Diakinesis) | কায়াজমার প্রান্তীয়করণ (Terminalization) ঘটে। নিউক্লিওলাস এবং নিউক্লিয়ার মেমব্রেন বিলুপ্ত হতে শুরু করে। |
১৫. মাইটোসিস ও মিয়োসিসের গুরুত্ব
| বিভাজন প্রক্রিয়া | গুরুত্ব |
|---|---|
| মাইটোসিস |
|
| মিয়োসিস |
|
১৬. অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিসের প্রভাব (আলীম স্যার)
অধ্যাপক মোঃ আবদুল আলীম স্যারের রেফারেন্সে বলা হয়েছে যে, মাইটোসিস যদি নিয়ন্ত্রিত না হয়, তবে এর ফলস্বরূপ অস্বাভাবিক কোষ বিভাজন ঘটে, যা টিউমার (Tumor) এবং ক্যান্সার (Cancer) বা নিওপ্লাসিয়া (Neoplasia) সৃষ্টি করে।
p53 প্রোটিন: কোষ বিভাজন নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিফেক্টিভ প্রোটিন হলো p53। এই প্রোটিন কোষচক্রের চেকপয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ করে এবং অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন রোধ করতে সাহায্য করে।
১৭. ক্রসিং ওভারের গুরুত্ব ও নিয়ামক (আলীম স্যার)
ক্রসিং ওভার হলো সমসংস্থ ক্রোমোজোমের নন-সিস্টার ক্রোমাটিডগুলোর মধ্যে খণ্ড বিনিময় (Exchange of segments)। এটি মিয়োসিস-১ এর প্যাকিনেমা উপধাপে ঘটে।
[Image of crossing over in chromosomes]ক্রসিং ওভারের গুরুত্ব (অধ্যাপক আলীম স্যারের রেফারেন্সে):
- জিনের পুনঃসংযোজন (Recombination): এর ফলে জিনের নতুন সমন্বয় বা পুনঃসংযোজন ঘটে।
- প্রকরণ সৃষ্টি (Variation): এটি প্রকরণ বা ভেদ সৃষ্টির প্রধান কারণ, যা নতুন প্রজাতির উৎপত্তির (Evolution) জন্য অপরিহার্য।
- নতুন বৈশিষ্ট্য: নতুন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীব সৃষ্টি হয়।
- ম্যাপ তৈরি: ক্রোমোজোমের জেনেটিক ম্যাপ (Genetic map) তৈরি করা সম্ভব হয়।
- বৃদ্ধি: ফল ও ফুলের আকার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
ক্রসিং ওভারের নিয়ামক (Controlling Factors):
ক্রসিং ওভারের হার নিম্নলিখিত কিছু নিয়ামকের উপর নির্ভর করে:
- তাপমাত্রা (Temperature)
- বয়স (Age)
- এক্স-রে (X-rays)
- রাসায়নিক পদার্থ
- লিঙ্গ (Sex)
- ক্রোমোজোমের দৈর্ঘ্য
কোষ বিভাজনের প্রক্রিয়াটি একটি কারখানার মতো, যেখানে মাইটোসিস হলো দৈনন্দিন রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য ব্যবহৃত উৎপাদন লাইন, যা মূল পণ্যের (মাতৃকোষ) হুবহু নকল তৈরি করে। অন্যদিকে, মিয়োসিস হলো একটি বিশেষায়িত প্রক্রিয়া যা নতুন ডিজাইনের উপাদান (গ্যামেট) তৈরি করে, যেখানে ক্রসিং ওভার নতুন বৈশিষ্ট্য এবং প্রকরণ যোগ করে, যা বিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনের পথ খুলে দেয়।
১৮. কার্বোহাইড্রেট, অ্যামিনো এসিড, প্রোটিন ও লিপিড
এই চারটি প্রধান জৈব অণু (Biomolecule) হলো কোষ রসায়নের ভিত্তি।
কার্বোহাইড্রেট (Carbohydrate)
কার্বোহাইড্রেট হলো পলিহাইড্রোক্সি অ্যালডিহাইড বা পলিহাইড্রোক্সি কিটোনধর্মী যৌগ। এদের সাধারণ সংকেত $\text{C}_x(\text{H}_2\text{O})_y$ এবং এতে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের অনুপাত সাধারণত $1:2:1$ হয়।
[Image of glucose and fructose structure]| শ্রেণিবিভাগ | উদাহরণ | কাজ |
|---|---|---|
| মনোস্যাকারাইড | গ্লুকোজ (রক্তে পাওয়া যায়), ফ্রুক্টোজ (ফলের শর্করা), রাইবোজ। | দ্রুত শক্তি সরবরাহ করা (জারণের মাধ্যমে)। নিউক্লিক অ্যাসিডের (যেমন রাইবোজ) গাঠনিক উপাদান। |
| ডাইস্যাকারাইড | সুক্রোজ (গ্লুকোজ + ফ্রুক্টোজ), মল্টোজ (গ্লুকোজ + গ্লুকোজ), ল্যাক্টোজ (গ্লুকোজ + গ্যালাক্টোজ)। | খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং মনোস্যাকারাইডে ভেঙে শক্তি দেয়। |
| পলিস্যাকারাইড | শ্বেতসার (Starch), সেলুলোজ, গ্লাইকোজেন (প্রাণীদেহে সঞ্চিত খাদ্য)। | শক্তি সঞ্চয় (শ্বেতসার, গ্লাইকোজেন)। উদ্ভিদের কোষ প্রাচীরের গাঠনিক উপাদান (সেলুলোজ)। |
কার্বোহাইড্রেট জাতক (Carbohydrate Derivatives) (আলীম স্যার)
উৎসগুলোতে কার্বোহাইড্রেট জাতক বা ডিরাইভড কার্বোহাইড্রেটের উদাহরণ হিসেবে এমন যৌগগুলোর উল্লেখ রয়েছে, যা কার্বোহাইড্রেট থেকে উদ্ভূত হয়:
- গ্লুকুরোনিক অ্যাসিড, গ্যালাক্টোসামিন।
- কাইটিন (Chitin): এটি ছত্রাক এবং পোকামাকড়ের খোলসের কোষ প্রাচীরের গাঠনিক উপাদান।
- হেপারিন (Heparin): এটি রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দানকারী (Anticoagulant) হিসেবে কাজ করে।
অ্যামিনো এসিড (Amino Acid)
অ্যামিনো এসিড হলো প্রোটিনের গাঠনিক একক। প্রতিটি অ্যামিনো এসিডে একটি অ্যামিনো ($\text{-NH}_2$) এবং একটি কার্বক্সিল ($\text{-COOH}$) গ্রুপ থাকে।
[Image of amino acid general structure]| ধরণ/শ্রেণিবিভাগ | উদাহরণ | কাজ |
|---|---|---|
| অত্যাবশ্যকীয় (যা শরীর তৈরি করতে পারে না) | ১০ টি অ্যামিনো এসিড (PVT TIM HALL): ফেনাইল অ্যালানিন, ভ্যালিন, ট্রিপ্টোফ্যান, থ্রিওনিন, আইসোলিউসিন, মিথিওনিন, হিস্টিডিন, আর্জিনিন, লিউসিন, লাইসিন। | প্রোটিন সংশ্লেষণের জন্য অপরিহার্য। |
| অ-অত্যাবশ্যকীয় (যা শরীর তৈরি করতে পারে) | অ্যালানিন, অ্যাসপার্টিক অ্যাসিড, গ্লুটামিক অ্যাসিড। | প্রোটিন সংশ্লেষণ ছাড়াও বিপাক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া। |
| শর্তসাপেক্ষে অত্যাবশ্যকীয় | আর্জিনিন (বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য জরুরি)। | প্রোটিন সংশ্লেষণ, কিছু হরমোন ও নিউরোট্রান্সমিটারের পূর্বসূরি হিসেবে কাজ করা। |
প্রোটিন (Protein)
প্রোটিন হলো অ্যামিনো অ্যাসিডের পলিমার, যা পেপটাইড বন্ধন দ্বারা যুক্ত থাকে।
[Image of protein folding structure]| শ্রেণিবিভাগ (উপাদানের ভিত্তিতে) | উদাহরণ | গুরুত্বপূর্ণ কাজ |
|---|---|---|
| সরল প্রোটিন (Simple Protein) (কেবল অ্যামিনো অ্যাসিড দ্বারা গঠিত) |
অ্যালবুমিন (ডিমের সাদা অংশ, রক্তরস), গ্লোবিউলিন (ইমিউনোগ্লোবিউলিন), হিস্টোন (DNA-এর সাথে যুক্ত মৌলিক প্রোটিন), প্রোলামিন (গ্লুটেনিন)। | অঙ্গাণুর গাঠনিক উপাদান (যেমন, হিস্টোন ক্রোমাটিনের অংশ)। |
| সংযুক্ত প্রোটিন (Conjugated Protein) (প্রোটিনের সাথে অপ্রোটিন অংশ (Prosthetic group) যুক্ত থাকে) |
লাইপোপ্রোটিন (লিপিড + প্রোটিন), গ্লাইকোপ্রোটিন (কার্বোহাইড্রেট + প্রোটিন), নিউক্লিওপ্রোটিন। | পরিবহন (যেমন লাইপোপ্রোটিন কোলেস্টেরল পরিবহন করে)। প্রতিরক্ষামূলক (ইমিউনোগ্লোবিউলিন)। |
লিপিড (Lipid)
লিপিড হলো ফ্যাটি অ্যাসিড ও অ্যালকোহলের (যেমন গ্লিসারল) এস্টার। এরা জলে অদ্রবণীয় কিন্তু ক্লোরোফর্ম ও ইথার-এর মতো জৈব দ্রাবকে দ্রবণীয়।
| শ্রেণিবিভাগ | উদাহরণ | গুরুত্বপূর্ণ কাজ |
|---|---|---|
| সরল লিপিড (Simple Lipid) | ফ্যাট বা তেল (ট্রাইগ্লিসারাইড), মোম (Wax)। | শক্তি সঞ্চয় (প্রতি গ্রাম লিপিড থেকে $৯.৫ \text{ kcal}$ শক্তি পাওয়া যায়)। ত্বককে সুরক্ষা প্রদান। |
| যৌগিক লিপিড (Compound Lipid) | ফসফোলিপিড (Lecithin, Cephalin), লাইপোপ্রোটিন। | কোষ পর্দার গাঠনিক উপাদান (ফসফোলিপিড দ্বিস্তর)। রক্তে লিপিড পরিবহন (লাইপোপ্রোটিন)। |
| উদ্ভূত লিপিড (Derived Lipid) | স্টেরয়েড (কোলেস্টেরল, হরমোন), টারপিনস। | হরমোন তৈরি এবং কোষ পর্দার স্থায়িত্ব প্রদান (কোলেস্টেরল)। |
১৯. এনজাইম: বৈশিষ্ট্য, শ্রেণিবিভাগ ও ব্যবহার, প্রভাবক সমূহ
এনজাইমের বৈশিষ্ট্য
এনজাইম হলো জৈব অনুঘটক বা জৈব প্রভাবক, যা রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বাড়ায় কিন্তু নিজে অপরিবর্তিত থাকে।
- এনজাইমগুলো প্রধানত প্রোটিনধর্মী (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন রাইবোজাইম)।
- এদের কাজ সুনির্দিষ্ট (Highly Specific), অর্থাৎ একটি এনজাইম সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সাবস্ট্রেটের উপরেই কাজ করে।
- এনজাইম তাপ-সংবেদনশীল (Heat sensitive); এরা সাধারণত $35^\circ \text{C}-40^\circ \text{C}$ তাপমাত্রায় সর্বোচ্চ কার্যকারিতা দেখায়। উচ্চ তাপমাত্রায় ($60^\circ \text{C}$ এর বেশি) এদের প্রোটিন কাঠামো নষ্ট হয়ে যায় (Denatured)।
- এরা $\text{pH}$-সংবেদনশীল; প্রতিটি এনজাইমের একটি নির্দিষ্ট সর্বোত্তম $\text{pH}$ আছে (যেমন: পেপসিনের জন্য $\text{pH } 2.0$ এবং ট্রিপসিনের জন্য $\text{pH } 8.0$)।
- এরা অ্যাকটিভ সাইটে সাবস্ট্রেটের সাথে যুক্ত হয়ে অ্যাকটিভেশন এনার্জি (Activation Energy) হ্রাস করে।
এনজাইমের শ্রেণিবিভাগ ও উদাহরণ
এনজাইম যে ধরনের যৌগকে ভাঙতে সাহায্য করে, তার ভিত্তিতে তাদের শ্রেণিবিভাগ করা যায়:
| কাজের ধরণ | এনজাইম (উদাহরণ) | সাবস্ট্রেট |
|---|---|---|
| কার্বোহাইড্রেট পরিপাককারী | টায়ালিন (Ptyalin)/অ্যামাইলেজ, মল্টেজ, সুক্রেজ, ল্যাক্টেজ। | শর্করা (যেমন শ্বেতসার, মল্টোজ, সুক্রোজ)। |
| প্রোটিন পরিপাককারী | পেপসিন, রেনিন, ট্রিপসিন, ইরেপসিন (ডাইপেপটাইডেজ)। | প্রোটিন, পেপটন। |
| লিপিড পরিপাককারী | লাইপেজ। | চর্বি বা লিপিড। |
| নিউক্লিক অ্যাসিড পরিপাককারী | নিউক্লিওটেডেজ, নিউক্লিওসাইডেজ। | নিউক্লিক অ্যাসিড, নিউক্লিওটাইড। |
এনজাইমের ব্যবহার
এনজাইম জৈবিক প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়, যেমন প্রোটিন সংশ্লেষণ, খাদ্য পরিপাক, এবং বিভিন্ন বিপাকীয় চক্রে (যেমন ক্রেবস চক্র)।
এনজাইমের প্রভাবকসমূহ (Factors Affecting Enzyme Activity)
এনজাইমের কার্যকারিতা প্রধানত তিনটি নিয়ামক দ্বারা প্রভাবিত হয়: তাপমাত্রা, $\text{pH}$, এবং সাবস্ট্রেটের ঘনত্ব।
২০. প্রোসথেটিক গ্রুপ, কো-ফ্যাক্টর ও কো-এনজাইম
কিছু এনজাইম শুধুমাত্র প্রোটিন দিয়ে গঠিত হলেও (সরল এনজাইম), অধিকাংশ এনজাইম তাদের কাজ সম্পাদনের জন্য একটি প্রোটিন অংশ (অ্যাপোএনজাইম) এবং একটি অপ্রোটিন অংশ (কো-ফ্যাক্টর) নিয়ে গঠিত হয়।
- কো-ফ্যাক্টর (Co-factor): এটি হলো এনজাইমের সাথে যুক্ত অপ্রোটিন অংশ। এটি অবশ্যই অ্যাপোএনজাইমের সাথে আবদ্ধ থাকে। কো-ফ্যাক্টর ধাতব আয়ন (যেমন $\text{Mg}^{++}$, $\text{Mn}^{++}$, $\text{Fe}^{++}$, $\text{Cu}^{++}$) বা জটিল জৈব যৌগ হতে পারে।
- কো-এনজাইম (Co-enzyme): এটি হলো এক প্রকারের কো-ফ্যাক্টর, যা এনজাইমের সাথে শিথিলভাবে সংযুক্ত থাকে এবং এটি প্রায়শই কোনো ফাংশনাল গ্রুপ বা রাসায়নিক অংশ বহন করে। কো-এনজাইমগুলো প্রায়শই বিভিন্ন ভিটামিন থেকে তৈরি হয়। উদাহরণ: $\text{NAD}$, $\text{FAD}$, $\text{NADP}$, $\text{ATP}$ এবং কো-এনজাইম এ (Co-enzyme A)।
- প্রোসথেটিক গ্রুপ (Prosthetic Group): উৎসগুলোতে প্রোসথেটিক গ্রুপকে কো-ফ্যাক্টর বা কো-এনজাইম হিসেবেই গণ্য করা হয়েছে, যখন এই অপ্রোটিন অংশটি এনজাইমের সাথে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে।
২১. লিপিড প্রোফাইল এর ছক এবং কোলেস্টেরল
রক্তের লিপিড প্রোফাইল হলো বিভিন্ন ধরনের লাইপোপ্রোটিন (লিপিড ও প্রোটিনের সংযুক্ত রূপ) এবং কোলেস্টেরলের পরিমাণের একটি হিসাব। লাইপোপ্রোটিনগুলো রক্তে চর্বি (লিপিড) ও কোলেস্টেরল পরিবহনে সাহায্য করে।
লাইপোপ্রোটিন (Lipoprotein) এবং কোলেস্টেরল:
| প্রকারভেদ | পূর্ণরূপ | ভূমিকা |
|---|---|---|
| LDL | Low Density Lipoprotein | এটি 'খারাপ কোলেস্টেরল' (Bad Cholesterol) নামে পরিচিত। এটি যকৃৎ থেকে টিস্যুগুলিতে কোলেস্টেরল বহন করে। এর মাত্রা $100 \text{ mg/dl}$ এর বেশি হলে ধমনীতে কোলেস্টেরল জমতে পারে (Atherosclerosis)। |
| HDL | High Density Lipoprotein | এটি 'ভালো কোলেস্টেরল' (Good Cholesterol) নামে পরিচিত। এটি টিস্যু থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সংগ্রহ করে যকৃতে ফেরত পাঠাতে সাহায্য করে। |
| VLDL | Very Low Density Lipoprotein | ট্রাইগ্লিসারাইড পরিবহন করে। |
| IDL | Intermediate Density Lipoprotein | । |
| Chylomicron | খাদ্য থেকে শোষিত ট্রাইগ্লিসারাইডকে লিম্ফ হয়ে রক্তে পরিবহন করে। |
উৎস অনুসারে, মানুষের রক্তরসে লিপিডের মাত্রা প্রায় $0.15-1.20\%$। LDL-এর কাজ হলো যকৃৎ এবং অন্ত্র থেকে কোলেস্টেরল দেহের বিভিন্ন কোষে বহন করা। এর বিপরীতভাবে, HDL টিস্যু থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সংগ্রহ করে যকৃতে ফিরিয়ে আনে।
২২. ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া (আলীমসহ)
অনুজীব সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য, উৎসগুলোতে দেওয়া রেফারেন্স এবং অধ্যাপক আলীম স্যারের নোট সহকারে নিচে তুলে ধরা হলো:
ভাইরাস (Virus)
ভাইরাস হলো আ-কোষীয় (acellular) এবং বাধ্যতামূলক অন্তঃকোষীয় পরজীবী (obligate intracellular parasite), যা পোষক কোষের বাইরে নিষ্ক্রিয় থাকে কিন্তু পোষক কোষের অভ্যন্তরে বংশবৃদ্ধি করে।
ক. বৈশিষ্ট্য:
- ভাইরাস শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ধরণের নিউক্লিক এসিড (DNA অথবা RNA) বহন করে, কখনোই উভয়টি একসাথে বহন করে না।
- এদেরকে স্ফটিক বা কেলাসিত করা যায়।
- এরা এদের বংশবৃদ্ধির জন্য পোষক কোষের বিপাকীয় যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল।
- ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা তার ভেদ্যতা (permeability) ধর্ম থেকে উদ্ভূত হয়।
খ. গঠন (Structure):
একটি সম্পূর্ণ সংক্রামক ভাইরাস কণা হলো ভিরিয়ন (Virion)। ভিরিয়ন মূলত নিউক্লিক এসিড এবং একে ঘিরে থাকা প্রোটিন আবরণ ক্যাপসিড (Capsid) দিয়ে গঠিত। নিউক্লিক এসিড ও ক্যাপসিড একত্রে নিউক্লিওক্যাপসিড নামে পরিচিত।
গ. শ্রেণিবিভাগ ও উদাহরণ (গঠন ও নিউক্লিক এসিডের ভিত্তিতে):
আকৃতির ভিত্তিতে:- দণ্ডাকার (Rod-shaped): টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস (TMV)।
- বহুভুজাকার বা গোলকাকার (Polyhedral/Spherical): টিআইভি (TIV), পোলিও ভাইরাস, HIV।
- ব্যাঙাচি আকৃতির (Tadpole-shaped): $\text{T}_2$ ব্যাকটেরিওফাজ।
- ডিম্বাকার (Ovoid): ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস।
- পাউডারকোট আকৃতির (Pox-shaped/Brick-shaped): ভাকসিনিয়া ভাইরাস।
- DNA ভাইরাস: টিআইভি (TIV), $\text{T}_2$ ফাজ, হার্পিস, ভ্যারিওলা (বসন্ত), হেপাটাইটিস-বি (HBV)।
- RNA ভাইরাস: টিএমভি (TMV), HIV, পোলিও, হাম, ডেঙ্গু, ইবোলা।
ব্যাকটেরিয়া (Bacteria)
ব্যাকটেরিয়া হলো সরলতম প্রাককোষী (Prokaryotic) জীব, যাদের সুগঠিত নিউক্লিয়াস এবং ঝিল্লিবদ্ধ অঙ্গাণু অনুপস্থিত।
[Image of bacteria structure]ক. বৈশিষ্ট্য:
- এদের বংশগতির উপাদান হলো DNA, যা সাধারণত ক্রোমাটিন বস্তু বা নিউক্লিওয়েড নামে পরিচিত (নন-হিস্টোন প্রোটিন দিয়ে গঠিত)।
- কোষের অভ্যন্তরে রাইবোসোম (70S) থাকে।
- কোষ প্রাচীর পেপটিডোগ্লাইকান দিয়ে গঠিত।
- এরা মূলত দ্বি-বিভাজন (Binary Fission) প্রক্রিয়ায় বংশবৃদ্ধি করে।
খ. গঠন (Model Structure):
একটি আদর্শ ব্যাকটেরিয়ার গঠনে ক্যাপসুল, কোষ প্রাচীর, কোষ ঝিল্লি, ফ্লাজেলা, মেসোজোম, সাইটোপ্লাজম, নিউক্লিওয়েড (DNA), প্লাজমিড, রাইবোসোম এবং খাদ্য সঞ্চয়ী দানা (যেমন চর্বি) থাকতে পারে।
গ. শ্রেণিবিভাগ (আকৃতির ভিত্তিতে) ও উদাহরণ:
- কক্কাস (Coccus): গোলাকার (যেমন: Diplococcus pneumoniae - নিউমোনিয়া সৃষ্টিকারী)।
- ব্যাসিলাস (Bacillus): দণ্ডাকার (Bacillus subtilis)।
- স্পাইরিলাম (Spirillum): প্যাঁচানো আকৃতির।
- ভিบริও (Vibrio): কমা-আকৃতির (যেমন: Vibrio cholerae - কলেরা সৃষ্টিকারী)।
ঘ. অর্থনৈতিক গুরুত্ব (আলীমসহ):
উপকারিতা:- নাইট্রোজেন সংবন্ধন: Rhizobium (শিম জাতীয় উদ্ভিদে), Azotobacter, Pseudomonas এবং Clostridium ব্যাকটেরিয়া মাটির উর্বরতা বাড়াতে নাইট্রোজেন সংবন্ধনে সাহায্য করে।
- অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন: অ্যাক্টিনোমাইসিটিস (Actinomycetes) গোত্রের ব্যাকটেরিয়া থেকে অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন: স্ট্রেপটোমাইসিন) তৈরি হয়।
- শিল্প ও খাদ্য: Lactobacillus দই (curd) উৎপাদনে এবং ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়।
- ভ্যাকসিন উৎপাদন: ডিপথেরিয়া, পারটুসিস (Pertussis) ও টিটেনাস (Tetanus)-এর জন্য ডিপিটি (DPT) ভ্যাকসিন তৈরিতে ব্যাকটেরিয়া ব্যবহৃত হয়।
- মানুষের রোগ: নিউমোনিয়া, কলেরা (Vibrio cholerae), টাইফয়েড (Salmonella typhi), কুষ্ঠ, ডিপথেরিয়া, টিটেনাস।
- উদ্ভিদ রোগ: ধানের ব্লাইট রোগ (Xanthomonas oryzae) সৃষ্টি করে।
২৩. লাইটিক ও লাইসোজোনিক চক্রের মধ্যে পার্থক্যের ছক
ভাইরাস যখন ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে, তখন বংশবৃদ্ধির জন্য দুটি চক্রের আশ্রয় নেয়। উৎসসমূহে প্রদত্ত পার্থক্যগুলো নিম্নরূপ:
[Image of lytic and lysogenic cycles]| বৈশিষ্ট্য | লাইটিক চক্র (Lytic Cycle) | লাইসোজোনিক চক্র (Lysogenic Cycle) |
|---|---|---|
| ফল (Outcome) | পোষক কোষ lysis করে এবং নতুন ভাইরাস তৈরি হয়। | ব্যাকটেরিয়া কোষে DNA যুক্ত থাকে (Prophage)। |
| ভিরুলেন্স (Virulence) | ভিরুলেন্ট ফাজ (Virulent Phage) দ্বারা ঘটে। | টেম্পারেট ফাজ (Temperate Phage) দ্বারা ঘটে। |
| T-ফ্লিজ (T-Phage) | $\text{T}_2$ ফ্লিজ দ্বারা ঘটে এবং প্রায় ২০ মিনিটে পোষক কোষে লাইসিস (lysis) ঘটে। | T-ফ্লিজ দ্বারা ঘটে না। |
| DNA সংশ্লেষণ | পোষক কোষে শুধুমাত্র ভাইরাসের DNA সংশ্লেষিত হয়। | ব্যাকটেরিয়া DNA এর সাথে প্রফাজের DNA যুক্ত হয়ে বিভক্ত হয় (Prophage)। |
| কোষের পরিণতি | পোষক কোষ ধ্বংস হয়ে যায়। | পোষক কোষ ধ্বংস হয় না। |
২৪. ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে পার্থক্যের ছক
উৎসগুলোতে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার প্রধান পার্থক্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্র | ভাইরাস (Virus) | ব্যাকটেরিয়া (Bacteria) |
|---|---|---|
| আকার | ০.০৩ $\mu\text{m}$ থেকে ০.৩ $\mu\text{m}$ (অতি ক্ষুদ্র)। | ০.৫ $\mu\text{m}$ থেকে ১০ $\mu\text{m}$ (তুলনামূলকভাবে বড়)। |
| কোষের ধরণ | আ-কোষীয় (Acellular)। | প্রাককোষীয় (Prokaryotic)। |
| নিউক্লিক এসিড | DNA অথবা RNA (কখনোই দুটো নয়)। | DNA ও RNA (দুটোই উপস্থিত)। |
| প্রজনন | পোষক কোষের বিপাক ব্যবহার করে সংখ্যাবৃদ্ধি। | দ্বি-বিভাজন (Binary fission) প্রক্রিয়ায় বংশবৃদ্ধি করে। |
| কোষীয় অঙ্গাণু | অনুপস্থিত। | 70S রাইবোসোম, মেসোজোম ইত্যাদি উপস্থিত। |
| আচ্ছাদন | ক্যাপসিড (প্রোটিন) এবং কিছু ক্ষেত্রে এনভেলপ। | কোষ প্রাচীর (পেপটিডোগ্লাইকান) ও কোষ ঝিল্লি। |
| বৃদ্ধি | শুধুমাত্র জীবন্ত পোষক কোষেই বংশবৃদ্ধি করে। | কৃত্রিম মাধ্যমেও বংশবৃদ্ধি করতে পারে (যদি পোষক কোষে নির্ভরশীল না হয়)। |
২৫. ম্যালেরিয়া পরজীবী
ক. পরজীবী ও রোগের নাম:
ম্যালেরিয়া রোগের সৃষ্টিকারী পরজীবী হলো প্লাজমোডিয়াম (Plasmodium)। এই পরজীবী স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়।
খ. ম্যালেরিয়া পরজীবীর প্রকারভেদ ও রোগের বিবরণ:
চার ধরণের প্লাজমোডিয়াম দ্বারা সৃষ্ট রোগের সুপ্তাবস্থাকাল ও জ্বরের প্রকৃতি উৎসসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে:
| পরজীবীর নাম | রোগের নাম | জ্বরের প্রকৃতি (ফীভার সাইকেল) | সুপ্তাবস্থাকাল (Incubation Period) |
|---|---|---|---|
| P. vivax | বিনাইন টারশিয়ান ম্যালেরিয়া | ৪৮ ঘণ্টা পর পর জ্বর। | ১২-২০ দিন বা ১১-২০ দিন। |
| P. falciparum | ম্যালিগন্যান্ট টারশিয়ান ম্যালেরিয়া | ৩৬-৪৮ ঘণ্টা পর পর জ্বর। | ৮-১৫ দিন বা ৮-১১ দিন। |
| P. malariae | কোয়ার্টান ম্যালেরিয়া | ৭২ ঘণ্টা পর পর জ্বর। | ১৮-৪০ দিন। |
| P. ovale | মাইল্ড টারশিয়ান ম্যালেরিয়া | ৪৮ ঘণ্টা পর পর জ্বর। | ১১-১৬ দিন। |
গ. রোগের লক্ষণসমূহ (Symptoms):
- রোগের প্রধান লক্ষণ হলো জ্বর, শীত ও কাঁপুনি (Fever, chills, and rigors)।
- প্লাজমোডিয়ামের বিপাকের ফলে হিমোজয়েন (Haemozoen) নামক রঞ্জক পদার্থ তৈরি হয়, যা জ্বরের জন্য দায়ী।
- সংক্রমণের ফলে রক্তে লোহিত কণিকার (RBC) সংখ্যা কমে যায় এবং মেগালোব্লাস্টিক রক্তাল্পতা (Megaloblastic anaemia) দেখা দিতে পারে।
ঘ. জীবনচক্র (Life Cycle):
ম্যালেরিয়া পরজীবী P. vivax এর জীবনচক্র দুটি পোষকের মধ্যে সম্পন্ন হয়: মানুষ (মধ্যবর্তী পোষক/Intermediate Host) এবং স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা (নিশ্চিত পোষক/Definitive Host)।
সংক্রামক দশা (Infective Stage):- মানুষের জন্য সংক্রামক দশা: স্পোরোজোয়েট (Sporozoite)।
- মশার জন্য সংক্রামক দশা: গ্যামেটোসাইট (Gametocyte)।
- এক্সো-এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি: যকৃত কোষকে আক্রমণ করে।
- এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি: লোহিত রক্তকণিকাকে আক্রমণ করে।
- মশা গ্যামেটোসাইট গ্রহণ করে, যা মশার পেটে উসিস্ট (Oocyst) গঠন করে।
- উসিস্ট থেকে স্পোরোজোয়েট তৈরি হয়, যা মশার লালাগ্রন্থিতে জমা হয় এবং মানুষকে সংক্রমিত করার জন্য প্রস্তুত হয়।
২৬. ভাইরাস জনিত রোগ (আলীমসহ)
উৎসগুলোতে দেওয়া ভাইরাস জনিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ ও তাদের ভাইরাস নিচে উল্লেখ করা হলো। অধ্যাপক আলীম স্যারের নোটে ইন্টারফেরন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাস উল্লেখ করা হয়েছে।
ক. সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ (Mnemonic সহ):
বিভিন্ন ভাইরাসের কারণে মানুষের যে রোগগুলো হয়:
- হাম (Measles)
- হার্পিস (Herpes): হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস (Herpes simplex virus)
- ইনফ্লুয়েঞ্জা (Influenza)
- জন্ডিস (Jaundice) বা ভাইরাল হেপাটাইটিস (Viral Hepatitis)।
- পোলিও (Polio): পোলিও ভাইরাস।
- এইডস (AIDS): HIV ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট।
- জলাতঙ্ক (Rabies): র্যাবিস ভাইরাস।
- বসন্ত (Small Pox/Variola): ভ্যারিওলা ভাইরাস।
- জলবসন্ত (Chicken Pox): ভ্যারিসেলা-জোস্টার ভাইরাস (Varicella-Zoster virus)।
- ডেঙ্গু (Dengue): Flavi ভাইরাস গোত্রের DENV-1, 2, 3, 4 সেরোটাইপ দ্বারা সৃষ্ট। ডেঙ্গুকে 'হাড়ভাঙ্গা জ্বর' (Bone Breaking Fever) বলা হয়।
- চিকুনগুনিয়া (Chikungunya): এটি টোগাভাইরাস গোত্রের একটি RNA ভাইরাস।
- সোয়াইন ফ্লু (Swine Flu): এটি ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস ($\text{H}_1\text{N}_1$) দ্বারা সৃষ্ট।
- ইবোলা ভাইরাস ডিজিজ (EVD): ইবোলা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট।
খ. অধ্যাপক আলীম স্যারের রেফারেন্সের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
- ইন্টারফেরন (Interferon): এটি একটি বিশেষ ধরণের প্রোটিন, যা কোষ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে তৈরি করে এবং অন্যান্য কোষকে ভাইরাস আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা প্রদান করে।
- হেপাটাইটিস ভাইরাস: হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস (HBV) একটি DNA ভাইরাস এবং হেপাটাইটিস-সি ভাইরাস (HCV) একটি RNA ভাইরাস। HBV-এর সুপ্তিকাল ৪২ থেকে ২৪০ দিন পর্যন্ত হতে পারে।
- COVID-19: নতুন করোনা ভাইরাস রোগটি SARS-CoV-2 (RNA ভাইরাস) দ্বারা সৃষ্ট। এই রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে জ্বর, শুষ্ক কাশি, শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি, গলা ব্যথা, মাথা ব্যথা এবং ডায়রিয়া অন্তর্ভুক্ত।
২৭. শৈবাল ও ছত্রাক (আলীমসহ)
উদ্ভিত জগতে শৈবাল (Algae) ও ছত্রাক (Fungi) উভয়ই প্রধানত থ্যালোফাইটা (Thallophyta) বিভাগের অন্তর্গত।
শৈবাল (Algae)
শৈবাল হলো ক্লোরোফিলযুক্ত, সাধারণত জলজ এবং স্ব-খাদ্য প্রস্তুতকারী (Autotrophic) উদ্ভিদ। শৈবাল বিদ্যাকে ফাইকোলজি (Phycology) বলা হয়।
ক. বৈশিষ্ট্য ও গঠন:
- শৈবালে ক্লোরোফিল থাকে, তাই এরা সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে।
- এদের দেহ মূল, কাণ্ড ও পাতায় বিভক্ত নয় (থ্যালয়েড বা সমাঙ্গদেহী)।
- এদের কোষ প্রাচীরের মূল উপাদান হলো সেলুলোজ।
- এরা একককোষী (Chlamydomonas) বা বহুকোষী (সূত্রাকার, কলোনিয়াল) হতে পারে।
- শৈবালের ক্লোরোপ্লাস্টের অভ্যন্তরে পাইরিনয়েড (Pyrenoid) নামক অঙ্গাণু থাকতে পারে, যা গ্রিড বা জালিকার (grid style) মতো হতে পারে (Ulothrix এর ক্ষেত্রে)।
খ. জনন (Reproduction):
শৈবাল প্রধানত তিন উপায়ে জনন সম্পন্ন করে:
- অঙ্গজ জনন (Vegetative Reproduction): খণ্ডায়ন (Fragmentation)।
- অযৌন জনন (Asexual Reproduction): রেনু (Spore) সৃষ্টির মাধ্যমে, যেমন: জুস্পোর (Zoospore) (চলনক্ষম রেনু) বা অ্যাপ্লানোস্পোর (Aplanospore) (নিষ্ক্রিয় রেনু) তৈরি হয়।
- যৌন জনন (Sexual Reproduction): তিন প্রকারের হতে পারে—আইসোগ্যামি (Isogamy), অ্যানআইসোগ্যামি (Anisogamy) এবং ঊগ্যামি (Oogamy)।
গ. গুরুত্ব (Importance):
- খাদ্য হিসেবে: সামুদ্রিক শৈবাল (যেমন: Laminaria, Gracilaria) খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- শক্তি উৎপাদন: Chlorella (সবুজ শৈবাল) সেকেন্ড জেনারেশন বায়োফুয়েল (Second generation biofuel) উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
ছত্রাক (Fungi)
ছত্রাক হলো ক্লোরোফিলবিহীন, পরভোজী (Heterotrophic) সুকেন্দ্রীয় (Eukaryotic) উদ্ভিদ। ছত্রাক বিদ্যাকে মাইকোলজি (Mycology) বলা হয়।
[Image of different types of fungi]ক. বৈশিষ্ট্য ও গঠন:
- এরা পরজীবী (Parasitic) বা মৃতজীবী (Saprophytic) হতে পারে।
- ছত্রাকের কোষ প্রাচীর কাইটিন (Chitin) দ্বারা গঠিত। কাইটিন হলো কার্বোহাইড্রেট জাতক যা ছত্রাক কোষে পাওয়া যায়।
- এদের সঞ্চিত খাদ্য হলো গ্লাইকোজেন (Glycogen) এবং কিছু তেল বা চর্বি।
- ছত্রাকের দেহ মাইসেলিয়াম (Mycelium) নামে পরিচিত, যা অসংখ্য হাইফা (Hyphae) দিয়ে গঠিত।
খ. জনন (Reproduction):
ছত্রাক প্রধানত স্পোর (রেনু) সৃষ্টির মাধ্যমে জনন সম্পন্ন করে।
- অযৌন জনন: কনিডিয়া (Conidia) বা স্পোরাঞ্জিওস্পোর (Sporangiospore) সৃষ্টির মাধ্যমে।
- যৌন জনন: গ্যামেটিক সংযোগ (Gametic copulation), গ্যামেটেঞ্জিয়াল সংযোগ (Gametangial copulation) ইত্যাদি প্রক্রিয়ায়।
গ. গুরুত্ব (Importance):
- ঔষধ উৎপাদন: Penicillium notatum থেকে বিখ্যাত পেনিসিলিন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হয়।
- খাদ্য উৎপাদন: ঈস্ট (Saccharomyces) রুটি ও অ্যালকোহল উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
- কৃষি: Claviceps purpurea নামক ছত্রাক থেকে এরগট (ergot) তৈরি হয়, যা ঔষধ ও কৃষি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
২৮. Ulothrix ও Agaricus: গঠন, জনন, গুরুত্ব
Ulothrix (সবুজ শৈবাল)
- গঠন: Ulothrix হলো সূত্রাকার, শাখাবিহীন সবুজ শৈবাল, যা একক সারি কোষ দিয়ে গঠিত। এদের কোষে ফিতা বা গাড়ির চাকার মতো (Girdle shaped) ক্লোরোপ্লাস্ট থাকে।
- জনন: অযৌন জনন কোয়াড্রিফ্ল্যাজেলেট (চার ফ্লাজেলাযুক্ত) জুস্পোর বা অ্যাপ্লানোস্পোরের মাধ্যমে ঘটে। যৌন জনন আইসোগ্যামি প্রকৃতির। এদের জীবনচক্র হ্যাপলন্টিক (Haplontic)।
- গুরুত্ব: Ulothrix প্রজনন বিদ্যায় গবেষণা এবং জলজ বাস্তুতন্ত্রে খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
Agaricus (ছত্রাক / মাশরুম)
[Image of Agaricus (Mushroom) structure]- গঠন: Agaricus হলো ব্যাসিডিওমাইকোটা বিভাগের ছত্রাক। এর দেহ মৃতজীবী মাইসেলিয়াম এবং বহুকোষী ফ্রুটিং বডি বা ব্যাসিডিওকার্প (Basidiocarp) নিয়ে গঠিত। ব্যাসিডিওকার্পের প্রধান অংশগুলো হলো ছত্রাক বা পাইলিয়াস (Pileus), স্টাইপ বা দণ্ড (Stipe), অ্যানুলাস বা বলয় (Annulus) এবং গিলের (Gills) নিচে ব্যাসিডিয়াম (Basidium) থাকে।
- জনন: যৌন জননের মাধ্যমে ব্যাসিডিওস্পোর (Basidiospore) সৃষ্টি হয়।
- গুরুত্ব: Agaricus (মাশরুম) একটি গুরুত্বপূর্ণ খাবার ছত্রাক।
২৯. প্রধান প্রধান শৈবাল শ্রেণির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি (ছক)
উৎসগুলোতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী শৈবালদের প্রধান শ্রেণিসমূহের পার্থক্য নিচে দেওয়া হলো:
| শৈবাল শ্রেণি | প্রচলিত নাম | প্রধান রঞ্জক পদার্থ | সঞ্চিত খাদ্য |
|---|---|---|---|
| Chlorophyta | সবুজ শৈবাল | ক্লোরোফিল $\text{a, b}$ | শ্বেতসার (Starch) |
| Phaeophyta | বাদামী শৈবাল | ক্লোরোফিল $\text{a, c}$, ফিউকোজ্যান্থিন | ম্যানিটল ও ল্যামিনারিন |
| Rhodophyta | লাল শৈবাল | ক্লোরোফিল $\text{a}$, ফাইকোএরিথ্রিন | ফ্লোরিডিয়ান স্টার্চ |
| Chrysophyta | সোনালী-বাদামী শৈবাল | ক্লোরোফিল $\text{a, c}$ | ক্রাইসোল্যামিনারিন |
| Pyrrophyta | ফায়ার অ্যালগি | ক্লোরোফিল $\text{a, c}$, লুসিফেরিন (আলোক-নিঃসরণকারী) | পারামাইলন (Paramylon) |
৩০. লাইকেন: লাইকেনের বৈশিষ্ট্য, শ্রেণিবিভাগ, উদাহরণ ও গুরুত্ব
লাইকেন হলো শৈবাল (Phycobiont/Photobiont) এবং ছত্রাক (Mycobiont) এর মধ্যে গড়ে ওঠা মিথোজীবীতা (Symbiosis), যেখানে এরা উভয়ই উপকৃত হয়।
ক. লাইকেনের বৈশিষ্ট্য:
- লাইকেনের শৈবাল অংশ (Photobiont) সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য প্রস্তুত করে।
- ছত্রাক অংশ (Mycobiont) শৈবালকে আশ্রয় ও জল শোষণ করে সরবরাহ করে।
- লাইকেনে সঞ্চিত কার্বোহাইড্রেট হিসাবে লাইকেনিন থাকে।
- এদের অভ্যন্তরীণ স্তরগুলোকে Upper Cortex, Algal layers, Medulla, Lower Cortex ও রাইজাইন (আবদ্ধ থাকার জন্য) দ্বারা গঠিত।
- এর ছত্রাক অংশটি সাধারণত অ্যাসকোমাইসিটিস (Ascomycetes) এবং শৈবাল অংশটি ক্লোরোফাইটা (Chlorophyta) বিভাগের অন্তর্গত।
খ. শ্রেণিবিভাগ (গঠন বা থ্যালাসের আকৃতির ভিত্তিতে):
উৎসগুলোতে লাইকেনের তিনটি প্রধান শ্রেণিবিভাগ উল্লেখ করা হয়েছে:
- ক্রাস্টোজ লাইকেন (Crustose Lichen): শক্ত, চ্যাপটা এবং শাঁসসদৃশ। (উদাহরণ: Graphis scripta)।
- ফলিয়োজ লাইকেন (Foliose Lichen): পাতা বা লতি সদৃশ। ( উদাহরণ: Parmelia)।
- ফ্রুটিকোজ লাইকেন (Fruticose Lichen): শাখাযুক্ত বা গুল্ম সদৃশ। (উদাহরণ: Cladonia, Usnea)।
গ. উদাহরণ ও গুরুত্ব:
- উদাহরণ: Cetraria islandica (আইসল্যান্ডিক মস) এবং Cladonia rangiferina (যা রেইনডিয়ার মস নামে পরিচিত)।
- গুরুত্ব: Cetraria islandica হাঁপানি (Asthma) রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও লাইকেন পাথরের উপর জন্মে প্রাথমিক মাটি তৈরি করতে সাহায্য করে।
৩১. শৈবাল ও ছত্রাক বৈচিত্র্য (আলীম)
অধ্যাপক মোঃ আবদুল আলীম স্যারের রেফারেন্সে এই জীবগুলোর গুরুত্ব ও প্রকৃতি সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য রয়েছে:
- শৈবালের বৈচিত্র্য: শৈবালের মধ্যে একককোষী ফর্ম (Chlamydomonas, Chlorella) থেকে শুরু করে জটিল বহুকোষী ফর্ম (Sargassum, Laminaria) পাওয়া যায়।
- ছত্রাকের বৈচিত্র্য ও গুরুত্ব: ছত্রাকের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণগুলির মধ্যে Agaricus (খাবার ছত্রাক) এবং Penicillium (অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদক) উল্লেখযোগ্য। ছত্রাকের প্রোটোপ্লাজমে রাইবোজোম, এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম, গলজি বডি, লাইসোজোম এবং মাইটোকন্ড্রিয়া থাকে।
- সঞ্চয়ী খাদ্য: শৈবালে স্টার্চ বা শ্বেতসার, আর ছত্রাকে গ্লাইকোজেন (প্রাণীজ শ্বেতসার) রূপে খাদ্য সঞ্চিত থাকে।
৩২. ছত্রাক গঠিত রোগ (আলীমসহ)
ছত্রাকের মাধ্যমে মানুষ এবং উদ্ভিদে সৃষ্ট কয়েকটি রোগ উৎসগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে:
[Image of ringworm fungal infection]| রোগের নাম | সৃষ্টিকারী ছত্রাক | প্রভাবিত অঙ্গ |
|---|---|---|
| দাদ/রিংওয়ার্ম (Ringworm) | T. rubrum, T. verroceum, Candida albicans (T. cruris, T. capitis, T. manus দ্বারাও হতে পারে) | ত্বক (Skin) |
| ব্লাইট রোগ (Blight) | Phytophthora (যেমন: P. infestans - আলুর লেট ব্লাইট) | উদ্ভিদ (পাতা, কান্ড) |
| অ্যাসপারজিলোসিস (Aspergillosis) | Aspergillus flavus | ফুসফুস (Lung) |
| ক্যান্ডিডিয়াসিস (Candidiasis) | Candida species | মুখ, গলা, ত্বক |
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
- Tinea rubrum, T. mentagrophytes, M. canis হলো দাদ বা ট্রাইকোফাইটন সংক্রমণ সৃষ্টিকারী ছত্রাক।
- ফাঙ্গাস দ্বারা সৃষ্ট রোগকে সাধারণত Mycosis বলা হয়।
এই আলোচনার মাধ্যমে শৈবাল ও ছত্রাককে দুটি ভিন্ন রাজ্য (Kingdom) হিসেবে চিত্রিত করা যায়: শৈবাল হলো প্রকৃতির সবুজ কারখানা, যারা নিজেরা শক্তি উৎপাদন করে, আর ছত্রাক হলো প্রকৃতির রিসাইক্লিং কর্মী, যারা পচনশীল পদার্থ থেকে পুষ্টি আহরণ করে বেঁচে থাকে।
৩৩. ব্রায়োফাইটা ও টেরিডোফাইটা: বৈশিষ্ট্য
ব্রায়োফাইটা এবং টেরিডোফাইটা হলো ক্রিপ্টোগ্যামিয়া (Cryptogamia) বা বীজবিহীন উদ্ভিদের প্রধান দুটি বিভাগ।
| বৈশিষ্ট্য | ব্রায়োফাইটা (Bryophyta) | টেরিডোফাইটা (Pteridophyta) |
|---|---|---|
| পরিবহন টিস্যু | অনুপস্থিত (নন-ভাস্কুলার উদ্ভিদ)। | উপস্থিত (ভাস্কুলার উদ্ভিদ)। এদের ভাস্কুলার ক্রিপ্টোগ্যামস বলা হয়। |
| উদ্ভিদ দেহ (প্রকৃতি) | মূল, কাণ্ড ও পাতায় বিভক্ত নয় (থ্যালয়েড বা সমাঙ্গদেহী)। | দেহ মূল, কাণ্ড ও পাতায় বিভক্ত। |
| প্রধান দশা | গ্যামিটোফাইট (Gametophyte, n) হলো প্রধান, স্বনির্ভর ও দীর্ঘস্থায়ী দশা। | স্পোরোফাইট (Sporophyte, 2n) হলো প্রধান, স্বনির্ভর ও দীর্ঘস্থায়ী দশা। |
| জননাঙ্গ | স্ত্রী জননাঙ্গ আর্কিগোনিয়াম (Archegonium) এবং পুং জননাঙ্গ অ্যান্থেরিডিয়াম (Antheridium)। | আর্কিগোনিয়াম (স্ত্রী জননাঙ্গ) এবং অ্যান্থেরিডিয়াম (পুং জননাঙ্গ) থাকে। |
| উদাহরণ | Riccia gangetica, Semibarbula orientalis, মস (Moss), লিভারওয়ার্ট (Liverwort)। | Pteris longifolia, ফান (Fern)। |
৩৪. Riccia ও Pteris: বৈশিষ্ট্য, গঠন ও জনন
Riccia (ব্রায়োফাইটা)
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| বৈশিষ্ট্য | Riccia হলো লিভারওয়ার্ট গোত্রের একটি ব্রায়োফাইটা উদ্ভিদ। এদের প্রধান দেহ গ্যামিটোফাইট। |
| গঠন | এর থ্যালাস সাধারণত গোলাকার হয়ে রিসেট (Rosette) আকৃতিতে সজ্জিত থাকে। থ্যালাসের নিচে মূলের পরিবর্তে রাইজয়েড (Rhizoid) থাকে, যা দ্বারা মাটিতে আবদ্ধ থাকে। |
| জনন | অঙ্গজ জনন: গ্যামা (Gemmae) বা টিউবার (Tuber) সৃষ্টির মাধ্যমে হয়। যৌন জনন: এটি ঊগ্যামাস (Oogamous) প্রকৃতির, যেখানে স্ত্রী জননাঙ্গ আর্কিগোনিয়াম এবং পুং জননাঙ্গ অ্যান্থেরিডিয়াম তৈরি হয়। নিষেকের জন্য পানির প্রয়োজন হয়। |
Pteris (টেরিডোফাইটা)
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| বৈশিষ্ট্য | Pteris একটি ফান বা ঢেঁকিশাক নামে পরিচিত। এদের প্রধান দেহ স্পোরোফাইট (2n)। |
| গঠন | দেহ মূল, কাণ্ড (রাইজোম) ও পাতায় (ফ্রন্ড) বিভক্ত। এর রাইজোম (Rhizome) কাণ্ড হিসেবে মাটির নিচে থাকে, যা শক্ত আঁশ (র্যামেন্টাম) দ্বারা আবৃত। পাতা সাধারণত যৌগিক (Compound leaf) এবং কচিপাতা কুণ্ডলিত আকারে থাকে, যাকে ক্রোজিয়ার (Crozier) বলা হয়। পাতার নিম্নপৃষ্ঠে স্পোরাঞ্জিয়াম গুচ্ছাকারে সোরাস (Sorus) গঠন করে। |
| জনন | অযৌন জনন: সোরাসে থাকা স্পোরাঞ্জিয়াম থেকে স্পোর (Sporophyll) উৎপন্ন হয়। যৌন জনন: স্পোর অঙ্কুরিত হয়ে হ্যাপ্লয়েড প্রোথ্যালাস (Prothallus) বা গ্যামিটোফাইট তৈরি করে। প্রোথ্যালাসে আর্কিগোনিয়াম ও অ্যান্থেরিডিয়াম গঠিত হয়। |
৩৫. জীবনচক্র ও জনুক্রম (Pteris)
Pteris এর জীবনচক্রে সুস্পষ্ট জনুক্রম বা Alternation of Generation দেখা যায়। এটি হেটারোমর্ফিক জনুক্রম (Heteromorphic alternation of generation) প্রদর্শন করে।
দুটি প্রধান দশা:
-
স্পোরোফাইটিক দশা (Sporophytic Generation - 2n):
এটি Pteris উদ্ভিদের প্রধান ও স্বনির্ভর দশা। এতে মূল, কাণ্ড ও পাতা থাকে। এই দশায় স্পোরোফিল (Sporophyll) থেকে স্পোরাঞ্জিয়াম (2n) উৎপন্ন হয়, যা মায়োসিস বিভাজনের মাধ্যমে স্পোর (n) তৈরি করে।
-
গ্যামিটোফাইটিক দশা (Gametophytic Generation - n):
স্পোর অঙ্কুরিত হয়ে ছোট, স্বাধীন, হৃদপিণ্ডাকার প্রোথ্যালাস (Prothallus) গঠন করে। প্রোথ্যালাস হলো গ্যামিটোফাইট। এতে পুং জননাঙ্গ (অ্যান্থেরিডিয়াম) ও স্ত্রী জননাঙ্গ (আর্কিগোনিয়াম) তৈরি হয়। অ্যান্থেরিডিয়াম থেকে শুক্রাণু এবং আর্কিগোনিয়াম থেকে ডিম্বাণু উৎপন্ন হয়।
জীবনচক্রের ধারাবাহিকতা:
স্পোরোফাইট (2n) $\xrightarrow{\text{মায়োসিস বিভাজন}}$ স্পোর (n) $\xrightarrow{\text{অঙ্কুরণ}}$ প্রোথ্যালাস (n) $\xrightarrow{\text{গ্যামেট তৈরি}}$ গ্যামেট (n) $\xrightarrow{\text{নিষেক (Fertilization)}}$ জাইগোট (2n) $\xrightarrow{\text{বৃদ্ধি}}$ নতুন স্পোরোফাইট (2n)
এই জীবনচক্রটি একটি দ্বিমুখী রাস্তার মতো, যেখানে স্পোরোফাইট দশা (২ন) মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় বৃদ্ধি পেয়ে স্পোরোফাইট কান্ড তৈরি করে, যা মায়োসিসের মাধ্যমে স্পোর (ন) তৈরি করে। এই স্পোরটি হলো গ্যামিটোফাইট দশা শুরু করার বীজ, যা নিষেক ঘটার মাধ্যমে আবার স্পোরোফাইট দশা শুরু করে। এভাবে হ্যাপ্লয়েড (n) এবং ডিপ্লয়েড (2n) দশা পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়।
৩৬. নগ্নবীজী ও আবৃতবীজী উদ্ভিদ: ভূমিকা ও পার্থক্য
উদ্ভিদ জগতের ফ্যানেরোগামিয়া (Phanerogamia) উপবিভাগকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: নগ্নবীজী (Gymnospermae) এবং আবৃতবীজী (Angiospermae)। ফ্যানেরোগামিয়া উদ্ভিদদের ফুল ও বীজ থাকে এবং এরা বীজের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে।
ভূমিকা:
- নগ্নবীজী উদ্ভিদ (Gymnosperms): এরা হলো সেই সকল সপুষ্পক উদ্ভিদ যাদের ফল হয় না। এদের বীজ ডিম্বাশয় প্রাচীর দ্বারা আবৃত থাকে না, ফলে বীজ উন্মুক্ত বা নগ্ন অবস্থায় থাকে।
- আবৃতবীজী উদ্ভিদ (Angiosperms): এদের ফল হয়। এদের বীজ ডিম্বাশয়ের ভেতরে আবৃত অবস্থায় থাকে। এরা উদ্ভিদ জগতের সবচেয়ে উন্নত এবং সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি।
নগ্নবীজী ও আবৃতবীজী উদ্ভিদের মধ্যে পার্থক্যের ছক:
| বৈশিষ্ট্য | নগ্নবীজী (Gymnosperms) | আবৃতবীজী (Angiosperms) |
|---|---|---|
| বীজের প্রকৃতি | বীজ নগ্ন বা উন্মুক্ত থাকে। | বীজ ফলের ভেতরে আবৃত থাকে। |
| ফল সৃষ্টি | ফল সৃষ্টি হয় না। | ফল সৃষ্টি হয়। |
| পুষ্প | ফুল সরল এবং সাধারণত কোনো পুষ্পপত্র বিন্যাস থাকে না। | ফুল জটিল এবং সুস্পষ্ট পুষ্পপত্র বিন্যাস থাকে। |
| ডিম্বাশয় (Ovary) | অনুপস্থিত। | উপস্থিত। |
| উদাহরণ | Cycas pectinata, Ginkgo biloba, Ephedra। | Oryza sativa (ধান), Mangifera indica (আম)। |
৩৭. Cycas: বৈশিষ্ট্য, জনন ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
Cycas উদ্ভিদটি নগ্নবীজী (Gymnosperm) বিভাগের সাইকডোফাইটা (Cycadophyta) শ্রেণির অন্তর্গত।
বৈশিষ্ট্য:
- উপাধি: Cycas উদ্ভিদকে সাধারণত 'পাম ফার্ন' (Palm Fern) নামে অভিহিত করা হয়।
- কাণ্ড ও পাতা: এদের কাণ্ড শাখাবিহীন। এদের পাতা পক্ষল যৌগিক (Compound leaf) এবং পাতাগুলো চিরহরিৎ। এদের পাতা কুণ্ডলিত অবস্থায় থাকে।
- মূল: এদের মূল দুই প্রকার: সাধারণ মূল (যা মাটিতে আবদ্ধ থাকে) এবং বিশেষ ধরণের কোরালয়েড মূল (Coralloid root)। কোরালয়েড মূলে নীলাভ-সবুজ শৈবাল (Nostoc, Anabaena) সহজীবী হিসেবে বসবাস করে।
- বৃদ্ধি: Cycas উদ্ভিদের বৃদ্ধির হার খুবই ধীর।
জনন:
- এক-লিঙ্গী: Cycas উদ্ভিদ একলিঙ্গী (Dioecious), অর্থাৎ পুং ও স্ত্রী উদ্ভিদ আলাদা হয়।
- জননাঙ্গ: পুরুষ উদ্ভিদে পুং রেণুপত্র বা মাইক্রোস্পোরোফিল এবং স্ত্রী উদ্ভিদে স্ত্রী রেণুপত্র বা মেগাস্পোরোফিল সৃষ্টি হয়।
- ডিম্বক: Cycas-এর ডিম্বক হলো উদ্ভিদ জগতের মধ্যে বৃহত্তম ডিম্বক।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব:
- Cycas circinalis এবং Cycas revoluta প্রজাতির বীজ খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জাপানে Cycas revoluta এর বীজ স্টার্চ তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়।
- Cycas-এর কাণ্ডের মজ্জা (pith) থেকে সালাপি বা সাগো (sago) তৈরি করা হয়।
- এর কচি পাতা ভেজিটেবল বা সবজি হিসেবে খাওয়া হয়।
৩৮. স্বভাব, মূল, কাণ্ড, পাতা, ফল: প্রকার ও উদাহরণ
| অঙ্গ | প্রকারভেদ (Types) | উদাহরণ/বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| স্বভাব (Habit) | হার্ব (Herb) | নরম, কাষ্ঠল নয় এমন উদ্ভিদ (যেমন ধান)। |
| শ্রাব (Shrub) | মাঝারি আকারের, ঝোপঝাড়যুক্ত, কাষ্ঠল উদ্ভিদ (যেমন গোলাপ)। | |
| ট্রি (Tree) | বড়, কাষ্ঠল উদ্ভিদ (যেমন আম, জাম)। | |
| মূল (Root) | স্থানিক মূল (Tap root) | দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদে দেখা যায়। |
| গুচ্ছ মূল (Fibrous root) | একবীজপত্রী উদ্ভিদে দেখা যায়। | |
| কাণ্ড (Stem) | রাইজোম (Rhizome) | ভূগর্ভস্থ কাণ্ড (যেমন আদা)। |
| বাল্ব (Bulb) | রসালো কাণ্ড (যেমন পেঁয়াজ)। | |
| টিউবার (Tuber) | স্ফীত ভূগর্ভস্থ কাণ্ড (যেমন আলু)। | |
| পাতা (Leaf) | সরল পাতা (Simple leaf) | পাতা একক বা অবিভক্ত (যেমন আম, কলা)। |
| যৌগিক পাতা (Compound leaf) | পাতা একাধিক লিফলেটে বিভক্ত (যেমন গোলাপ, তেঁতুল)। | |
| জালিকা শিরাবিন্যাস (Reticulate) | দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদে। | |
| সমান্তরাল শিরাবিন্যাস (Parallel) | একবীজপত্রী উদ্ভিদে। | |
| ফল (Fruit) | প্রকৃত ফল (True fruit) | ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন হয় (যেমন আম)। |
৩৯. পুষ্পবিন্যাস, পুষ্পপত্রবিন্যাস ও অমরাবিন্যাস
| বিষয় | প্রকারভেদ (Types) | উদাহরণ/বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| পুষ্পবিন্যাস (Inflorescence) | রেসিমোস (Racemose) | মঞ্জরী অক্ষ বর্ধনশীল, পুরনো ফুল নিচে ও নতুন ফুল উপরে থাকে। |
| সাইমোস (Cymose) | মঞ্জরী অক্ষের বৃদ্ধি সীমিত, ফুলগুলো শীর্ষভাগে থাকে (যেমন: Delonix regia)। | |
| বিশেষ পুষ্পবিন্যাস | একবীজপত্রী উদ্ভিদে স্পাইকলেট (Spikelet) পুষ্পবিন্যাস দেখা যায়। | |
| পুষ্পপত্রবিন্যাস (Aestivation) | ভেলভেট (Valvate), টুইস্টেড (Twisted), ইমব্রিকেট (Imbricate), কুইনকানসিয়াল (Quincuncial) | পুষ্পপত্রগুলো কুঁড়ির ভেতরে যেভাবে সজ্জিত থাকে। |
| অমরাবিন্যাস (Placentation) | প্রান্তীয় (Marginal) | গর্ভাশয়ের কিনারা বরাবর ডিম্বক সজ্জিত (যেমন মটরশুঁটি)। |
| অক্ষীয় (Axile) | ডিম্বক ক অক্ষ বরাবর সজ্জিত (যেমন জবা, লেবু)। | |
| প্যারাইটাল (Parietal) | একাধিক গর্ভপত্রের কিনারা বরাবর সজ্জিত (যেমন শসা, কুমড়া)। | |
| মুক্তকেন্দ্রীয় (Free Central) | ডিম্বকগুলো গর্ভাশয়ের কেন্দ্রে মুক্ত অবস্থায় থাকে। |
৪০. একবীজপত্রী ও দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ: শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য
| বৈশিষ্ট্য | দ্বিবীজপত্রী (Dicotyledones) | একবীজপত্রী (Monocotyledones) |
|---|---|---|
| বীজপত্র (Cotyledon) | বীজে দুটি বীজপত্র থাকে। | বীজে একটি বীজপত্র থাকে। |
| শিরাবিন্যাস | পাতায় জালিকা শিরাবিন্যাস থাকে। | পাতায় সমান্তরাল শিরাবিন্যাস থাকে। |
| পুষ্পপত্র সংখ্যা | সাধারণত ৪ বা ৫ এর গুণিতকে থাকে। | সাধারণত ৩ বা ৬ এর গুণিতকে থাকে (Tri-merous)। |
| মূল | প্রধানত স্থানিক মূলতন্ত্র (Tap root)। | প্রধানত গুচ্ছ মূলতন্ত্র (Fibrous root)। |
| সংবহন বান্ডল | কাণ্ডের সংবহন বান্ডলগুলো বলয় আকারে সজ্জিত থাকে। | কাণ্ডের সংবহন বান্ডলগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো থাকে। |
| উদাহরণ | আম (Mangifera indica), মটর (Pisum sativum)। | ধান (Oryza sativa), কলা (Musa sapientum)। |
৪১. Poaceae ও Malvaceae গোত্র: গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদের নাম ও গুরুত্ব
Poaceae গোত্র (ধান গোত্র বা ঘাস পরিবার)
এটি আবৃতবীজী উদ্ভিদের একবীজপত্রী শ্রেণির একটি গুরুত্বপূর্ণ গোত্র।
- স্বভাব: প্রধানত বীরুত (Herb) জাতীয়।
- পুষ্পবিন্যাস: পুষ্পবিন্যাস স্পাইকলেট (Spikelet) বা স্পাইক ধরণের।
- ফল: ফল হলো ক্যারিওপসিস (Caryopsis)।
- গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদের নাম:
- ধান (Oryza sativa)
- গম (Triticum aestivum)
- ভুট্টা (Zea mays)
- আখ (Saccharum officinarum)
- বাঁশ (Bambusa tulda)
Malvaceae গোত্র (মালভেসি)
এটি আবৃতবীজী উদ্ভিদের দ্বিবীজপত্রী শ্রেণির একটি গোত্র।
- শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য: মালভেসি গোত্রের উদ্ভিদগুলো ম্যালোগ্লোমেরুলাস (Malvaglomerulus) নামক বিশেষ গঠন দ্বারা চিহ্নিত।
- পুষ্পপত্রবিন্যাস: এদের পুষ্পপত্রবিন্যাস টুইস্টেড (Twisted) বা পাকানো।
- গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদের নাম (Mnemonic: মেস কেন টেন চেয় কাগজ):
- মেস/মেস্তাপাট: Hibiscus sabdariffa
- কেন/কেনাফ: Hibiscus cannabinus
- ঢেঁড়স: Abelmoschus esculentus
- কার্পাস তুলা: Gossypium herbaceum
- জবা: Hibiscus rosa-sinensis (একে চীনের গোলাপ বলা হয়)
উদ্ভিদ জগতে এই গোত্রগুলোর সম্পর্ক একটি গ্রন্থাগারের মতো, যেখানে নগ্নবীজী উদ্ভিদ হলো প্রাচীন পুঁথি (বীজগুলি উন্মুক্ত), এবং আবৃতবীজী উদ্ভিদ হলো সুরক্ষিত বই (বীজগুলি ফলের মধ্যে আবৃত)। এর মধ্যে Poaceae গোত্রটি হলো সেই বিশাল সংগ্রহশালা যা আমাদের মৌলিক খাদ্য সরবরাহ করে (ধান, গম), আর Malvaceae হলো সেই অংশ যা তন্তু (তুলা, মেস্তাপাট) এবং ঔষধি গুণাগুণ (জবা) সরবরাহ করে।
৪২. ভাজক ও স্থায়ী টিস্যু: বৈশিষ্ট্য, শ্রেণিবিভাগ, উদাহরণ ও কাজ
উদ্ভিদের টিস্যুগুলো তাদের কোষ বিভাজন ক্ষমতার ভিত্তিতে প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত: ভাজক টিস্যু (Meristematic tissue) এবং স্থায়ী টিস্যু (Permanent tissue)।
ক. ভাজক টিস্যু (Meristematic Tissue)
[Image of plant meristematic tissue locations]বৈশিষ্ট্য:
- এই টিস্যুর কোষগুলো সর্বদা বিভাজনক্ষম হয়।
- কোষগুলো সাধারণত সমব্যাসীয় (Isodiametric), অর্থাৎ আকৃতিতে প্রায় সমান হয়।
- কোষ প্রাচীর পাতলা এবং সেলুলোজ নির্মিত।
- নিউক্লিয়াস বড় এবং সাইটোপ্লাজম ঘন।
- কোষের মধ্যে আন্তঃকোষীয় ফাঁকা স্থান অনুপস্থিত।
- কোষ গহ্বর (Vacuole) সাধারণত ছোট বা অনুপস্থিত থাকে, এবং কোষে খাদ্য সঞ্চয় হয় না।
শ্রেণিবিভাগ ও উদাহরণ:
- উৎপত্তি অনুসারে: প্রোমেরিস্টেম (Pro-meristem), প্রাইমারি মেজিস্টেম (Primary meristem) এবং সেকেন্ডারি মেজিস্টেম (Secondary meristem)।
- অবস্থান অনুসারে:
- শীর্ষ ভাজক টিস্যু (Apical meristem): মূল ও কাণ্ডের শীর্ষে অবস্থিত।
- নিবেশিত ভাজক টিস্যু (Intercalary meristem): মাঝখানে অবস্থিত।
- পার্শ্বীয় ভাজক টিস্যু (Lateral meristem): কাণ্ড বা মূলের পার্শ্বে অবস্থিত, যেমন ক্যাম্বিয়াম।
কাজ:
- কোষ বিভাজনের মাধ্যমে উদ্ভিদের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বৃদ্ধি ঘটানো।
- উদ্ভিদের নতুন অঙ্গ ও টিস্যু সৃষ্টি করা।
খ. স্থায়ী টিস্যু (Permanent Tissue)
বৈশিষ্ট্য:
- এই টিস্যুর কোষগুলো বিভাজন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
- কোষগুলো সুগঠিত এবং নির্দিষ্ট আকার ও আকৃতি লাভ করে।
- কোষ প্রাচীর পাতলা বা পুরু হতে পারে।
- এদের কোষে বড় কোষ গহ্বর থাকে।
শ্রেণিবিভাগ ও কাজ:
- সরল স্থায়ী টিস্যু (Simple Permanent Tissue):
- প্যারেনকাইমা (Parenchyma): পাতলা কোষ প্রাচীরযুক্ত। কাজ: খাদ্য প্রস্তুত (সালোকসংশ্লেষণ), খাদ্য সঞ্চয়।
- কোলেনকাইমা (Collenchyma): কোষ প্রাচীরের কোণে স্থূলতা দেখা যায়। কাজ: উদ্ভিদ অঙ্গকে যান্ত্রিক দৃঢ়তা ও স্থিতিস্থাপকতা প্রদান।
- স্ক্লেরেনকাইমা (Sclerenchyma): কোষ প্রাচীর পুরু ও লিগনিনযুক্ত। কাজ: উদ্ভিদ অঙ্গকে দৃঢ়তা ও শক্তি প্রদান।
- জটিল স্থায়ী টিস্যু (Complex Permanent Tissue):
- জাইলেম (Xylem): ট্রাকিড, ট্রাকিয়া, জাইলেম প্যারেনকাইমা ও ফাইবার নিয়ে গঠিত। কাজ: জল ও খনিজ লবণ পরিবহন।
- ফ্লোয়েম (Phloem): সিভনল, সঙ্গী কোষ, ফ্লোয়েম প্যারেনকাইমা ও ফাইবার নিয়ে গঠিত। কাজ: খাদ্য পরিবহন।
৪৩. ভাজক ও স্থায়ী টিস্যুর মধ্যে পার্থক্যের ছক
উৎসগুলোতে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলোর ভিত্তিতে এদের পার্থক্য নিচে দেওয়া হলো:
| বৈশিষ্ট্যের ভিত্তি | ভাজক টিস্যু (Meristematic Tissue) | স্থায়ী টিস্যু (Permanent Tissue) |
|---|---|---|
| বিভাজন ক্ষমতা | কোষগুলো বিভাজনক্ষম। | কোষগুলো সাধারণত বিভাজন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। |
| কোষের আকার | সাধারণত সমব্যাসীয়। | সুনির্দিষ্ট ও বিভিন্ন আকারের। |
| আন্তঃকোষীয় স্থান | অনুপস্থিত (কোষগুলো সংলগ্ন থাকে)। | উপস্থিত থাকতে পারে (যেমন প্যারেনকাইমা)। |
| কোষ গহ্বর | ছোট বা অনুপস্থিত। | সাধারণত বড় ও সুস্পষ্ট। |
| কাজ | বৃদ্ধি ও নতুন টিস্যু সৃষ্টি। | পরিবহন, সংরক্ষণ, দৃঢ়তা প্রদান। |
৪৪. টিস্যুতন্ত্র: প্রকারভেদ ও তাদের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন অংশের কাজ
উদ্ভিদ অঙ্গের মূল, কাণ্ড ও পাতার অভ্যন্তরীণ টিস্যুগুলোকে কার্যকারিতার ভিত্তিতে তিনটি প্রধান টিস্যুতন্ত্রে ভাগ করা হয়:
[Image of plant tissue systems diagram]| টিস্যুতন্ত্রের প্রকারভেদ | অন্তর্ভুক্ত অংশ (Components) | প্রধান কাজ |
|---|---|---|
| ১. ত্বকীয় টিস্যুতন্ত্র (Dermal Tissue System) | এপিডার্মিস (Epidermis), এপিডার্মাল অ্যাপেন্ডেজ (যেমন: ট্রাইকোম, স্কেলস, পত্ররন্ধ্র/Stomata)। | উদ্ভিদের ভিতরের অংশকে সুরক্ষা প্রদান করা। এপিডার্মিস কোষগুলো থেকে কিউটিকল নিঃসৃত হয়। |
| ২. ভিত্তি বা গ্রাউন্ড টিস্যুতন্ত্র (Ground Tissue System) | কর্টেক্স, মজ্জা (Pith), মজ্জারশ্মি (Medullary ray)। প্রধানত প্যারেনকাইমা, কোলেনকাইমা ও স্ক্লেরেনকাইমা নিয়ে গঠিত। | খাদ্য প্রস্তুত, খাদ্য সঞ্চয়, এবং উদ্ভিদ অঙ্গকে দৃঢ়তা প্রদান করা। |
| ৩. ভাস্কুলার টিস্যুতন্ত্র (Vascular Tissue System) | জাইলেম (Xylem) ও ফ্লোয়েম (Phloem)। এই দুটো টিস্যু একত্রে ভাস্কুলার বান্ডল গঠন করে। | উদ্ভিদের এক অংশ থেকে অন্য অংশে জল, খনিজ লবণ ও প্রস্তুত খাদ্য পরিবহন করা। |
৪৫. পত্ররন্ধ্র: গঠন ও প্রকারভেদ
গঠন ও বৈশিষ্ট্য:
[Image of plant stomata structure]পত্ররন্ধ্র (Stomata) হলো এপিডার্মিসে অবস্থিত ক্ষুদ্র ছিদ্র যা দুটি বিশেষ ধরণের কোষ দ্বারা বেষ্টিত থাকে, যাদের রক্ষী কোষ (Guard Cells) বলা হয়।
- রক্ষী কোষের ভেতরের প্রাচীর মোটা এবং বাইরের প্রাচীর পাতলা হয়।
- জলের পরিমাণ ও আলোকের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে রক্ষী কোষের স্ফীতি (Turgidity) পরিবর্তিত হয়, যার ফলে ছিদ্রটি খোলে বা বন্ধ হয়।
- পত্ররন্ধ্রের মাধ্যমে উদ্ভিদ প্রধানত বাষ্পমোচন (Transpiration) এবং গ্যাসীয় আদান-প্রদান ($\text{CO}_2$/$\text{O}_2$) সম্পন্ন করে।
প্রকারভেদ (অবস্থানের ভিত্তিতে):
উৎসগুলোতে পরিবেশের সাথে অভিযোজন অনুসারে পত্ররন্ধ্রের অবস্থানগত বৈচিত্র্য উল্লেখ করা হয়েছে:
- নিমজ্জিত পত্ররন্ধ্র (Sunken/Submerged Stomata): মরুজ বা জেরোফাইট উদ্ভিদে দেখা যায়, যেখানে পত্ররন্ধ্র এপিডার্মিসের গভীরে অবস্থিত থাকে, যা বাষ্পমোচনের হার কমায়।
- ভাসমান উদ্ভিদের পত্ররন্ধ্র: জলজ উদ্ভিদ, যেমন পদ্ম ও শাপলার মতো ভাসমান উদ্ভিদের ক্ষেত্রে পত্ররন্ধ্র শুধুমাত্র পাতার উপরিভাগে থাকে।
- নিমজ্জিত জলজ উদ্ভিদের পত্ররন্ধ্র: যেমন Hydrilla বা Vallisneria-এর মতো সম্পূর্ণ নিমজ্জিত জলজ উদ্ভিদে পত্ররন্ধ্র অনুপস্থিত।
৪৬. ভাস্কুলার বান্ডল: প্রকারভেদ ও উদাহরণ
জাইলেম ও ফ্লোয়েমের বিন্যাস অনুসারে ভাস্কুলার বান্ডল প্রধানত তিন প্রকার:
| প্রকারভেদ | জাইলেম ও ফ্লোয়েমের বিন্যাস | উদাহরণ |
|---|---|---|
| ১. অরীয় বান্ডল (Radial Vascular Bundle) | জাইলেম ও ফ্লোয়েম ভিন্ন ভিন্ন ব্যাসার্ধে পর্যায়ক্রমে সজ্জিত থাকে। | একবীজপত্রী উদ্ভিদের মূল। |
| ২. সমপার্শ্বীয় বান্ডল (Conjoint/Collateral) | জাইলেম ও ফ্লোয়েম একই ব্যাসার্ধে থাকে। | কাণ্ড ও পাতা। |
| ক. বদ্ধ সমপার্শ্বীয় (Closed Collateral): জাইলেম ও ফ্লোয়েমের মাঝে ক্যাম্বিয়াম অনুপস্থিত। | এটি একবীজপত্রী কাণ্ড ও পাতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। | |
| খ. মুক্ত সমপার্শ্বীয় (Open Collateral): জাইলেম ও ফ্লোয়েমের মাঝে ক্যাম্বিয়াম উপস্থিত। | এটি দ্বিবীজপত্রী কাণ্ড ও নগ্নবীজী উদ্ভিদে দেখা যায়। | |
| গ. সমদ্বিপার্শ্বীয় (Bicollateral): দুটি ফ্লোয়েমের মাঝে জাইলেম ও ক্যাম্বিয়াম থাকে। | (যেমন: কুমড়া, Cucurbita)। | |
| ৩. কেন্দ্রীয় বান্ডল (Concentric Bundle) | জাইলেম বা ফ্লোয়েমের যেকোনো একটি কেন্দ্রে অন্যটিকে আবৃত করে রাখে। | |
| হাইড্রোসেন্ট্রিক/অ্যাম্ফিব্রাইবাল: জাইলেম কেন্দ্রে। লেপটোসেন্ট্রিক/অ্যাম্ফিবাসাল: ফ্লোয়েম কেন্দ্রে। |
(যেমন: Pteris, Selaginella)। (যেমন: Yucca, Dracaena)। |
৪৭. একবীজপত্রী উদ্ভিদের মূল ও কাণ্ডের শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য
উৎসগুলোতে একবীজপত্রী উদ্ভিদের মূল (Monocot root) এবং কাণ্ড (Monocot stem) এর প্রধান শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করা হয়েছে:
একবীজপত্রী মূল (Monocot Root):
[Image of monocot root cross-section]- ভাস্কুলার বান্ডল: সংবহন বান্ডলগুলি অরীয় (Radial) প্রকৃতির।
- জাইলেম: জাইলেম বান্ডলের সংখ্যা সাধারণত ৬ বা তার বেশি (পলিয়ার্ক) হয়।
- মজ্জা: কেন্দ্রে সুগঠিত ও সুস্পষ্ট মজ্জা (Pith) থাকে।
- ক্যাম্বিয়াম: ক্যাম্বিয়াম অনুপস্থিত।
- পরিবহন বান্ডল: কেন্দ্রে ৬ বা তার বেশি সংখ্যক বান্ডল থাকে।
একবীজপত্রী কাণ্ড (Monocot Stem):
[Image of monocot stem cross-section]- সংবহন বান্ডল: সংবহন বান্ডলগুলো পুরো কাণ্ডে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো থাকে।
- প্রকার: বান্ডলগুলো বদ্ধ (Closed) এবং সমপার্শ্বীয় (Collateral) প্রকৃতির।
- বান্ডলের আকার: সাধারণত কাণ্ডের বাইরের দিকে বান্ডলগুলো ছোট এবং কেন্দ্রের দিকে বড় আকারের হয়।
- ক্যাম্বিয়াম: অনুপস্থিত থাকায় কাণ্ডের সেকেন্ডারি বৃদ্ধি হয় না।
- বান্ডল আবরণ: প্রতিটি ভাস্কুলার বান্ডল স্ক্লেরেনকাইমা টিস্যু দ্বারা গঠিত বান্ডল শীথ (Bundle Sheath) দ্বারা আবৃত থাকে।
সংক্ষেপে, উদ্ভিদের পরিবহন ব্যবস্থা একটি সুসংগঠিত হাইওয়ের মতো: ভাস্কুলার বান্ডলগুলি হলো হাইওয়ে, যেখানে জাইলেম জলের লরি এবং ফ্লোয়েম খাদ্যবাহী লরি। ভাজক টিস্যু হলো সেই নির্মাণ শ্রমিক যারা এই হাইওয়ে তৈরি করে এবং স্থায়ী টিস্যু হলো সেই কাঠামো, যা পুরো হাইওয়েটিকে সচল ও দৃঢ় রাখে।